শুক্রবার, ২৫ Jun ২০২১, ০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ :
সোনাপুর মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে এম.পি মানিককে সংবর্ধনা শিক্ষক নিবন্ধনের জাল সনদে ১০ বছর ধরে চাকরি! প্রকাশিত হয়েছে তরুণ লেখিকা হাসিনা হাসি’র উপন্যাস ‘গহীনে শব্দ’ যাদুকাটা নদী থেকে বালু পাথর উত্তোলন বন্ধ: বছরজুড়ে বেকার লক্ষাধিক শ্রমিক আসছে তরুণ লেখক জাকির হোসেন রাজু’র বই ‘না ছুঁয়ে তোমাকে ছোঁব’ কবিতা : কলম সৈনিক : আমিনুল ইসলাম সিলেট বিভাগীয় বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ এসোসিয়েশনের সহ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন এড. আবুল হোসেন বিশ্বম্ভরপুরে শ্রমিক লীগের উদ্যোগে কম্বল বিতরণ শাখা যাদুকাটা নদীর ভাঙ্গন: বিলিনের পথে বাগগাঁও-ডালারপাড় গ্রাম বাদাঘাট (দঃ) ইউপি নির্বাচন: আ’লীগের মনোনয়ন চান জামাল হোসেন

জাকির হোসেন রাজু’র উপন্যাস  ‘যুদ্ধশিশু’

মন একাদশ শ্রেনিতে পড়ে। ক্লাসের ফাস্টবয়। মায়ের একমাত্র আদরের সন্তান ইমন। এসএসসিতে জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। জন্মের পর থেকেই বাবা হারা ইমন মাকেই মা-বাবা হিসেবে জেনে এসেছে। মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ার কারণে যখন যা চাই মা তখন তাই দেয়। ইমনও মা ভক্ত সন্তান। মায়ের কথার অবাধ্য হয়না কখনো। মায়ের কাছে কখনোও কোন কিছু লুকায় না। বসন্তের বিকাল বেলা ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ৪টা বাজে। এমন সময় ইমন কোন দিন শুয়ে থাকে না। হয়তো বন্ধুদের সাথে খেলার মাঠে অথবা বাড়ির পাশের পুকুর পাড়ে বসে বসে বই পড়ে। আজ শুয়ে আছে,ঘরের কোনে রাখা পুরনো একটি ছবির দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে আর চোখ দিয়ে জল ঝড়ছে অঝর ধারায়। মনে হয় ইমনের মনের মাঝে হাজার বছরের জমানো কষ্ট গুলো তাকে আজ একসাথে এসে ঝাঁপ দিয়ে ধরেছে। চার দিক নিরব নিঃস্বদ্ধ, কারো সাড়া শব্দ নেই, লুকিয়ে লুকিয়ে কান্নার আওয়াজ গুলো আস্তে আস্তে করে আকাশের মেঘের সাথে ভেঁসে যাচ্ছে দূর থেকে বহু দূর। হঠাৎ করে বাড়ির উঠানোর বড় জারুল গাছটিকে বসন্তের কোকিলের মিষ্টি মধুর কুহ কুহ ডাক শোনা যাচ্ছে। কোকিলের কুহ কুহ ডাক শোনে ইমনের খেয়াল হলো সে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছে। ইমনের মা ফাহিমা খাতুন একটি বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলের সহকারি শিক্ষিকা। যে টাকা বেতন পান তা দিয়ে নুন আনতে পানতা পুরোয়। তাই স্কুল ছুটির পর বিকালে টিউশনি করেন। ইমনের মা প্রতিদিনকার মতো টিউশনি করতে চলে গেছে। ফিরতে সাড়ে ৫টা বাজবে। ইমন তার মা ফাহিমা খাতুন আর রহিমের মা ছাড়া এই বাড়িতে আর কেউ নেই। রহিমের মা কখন যে তাদের আতœার আতœীয় হয়ে গেছে তারা কেউ বলতে পারেনা। রহিমের মা’রও এ দুনিয়াতে ইমন আর তার মা ছাড়া আর কেউ নেই। আব্দুর রহিম নামে একটি ফুট ফুটে ৭বছরের ছেলে ছিল। একাত্তরের যুদ্ধে পাক বাহিনীরা রহিমের বাবা আজাদ চৌধুরী-মা আর রহিম কে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কি নির্মমভাবে হত্যা করেছে নিজের সামনে স্বামী-সন্তানকে সেই করুণ কাহিনী এখনও ভুলতে পারেনা রহিমের মা। তাই প্রতিরাতে নামাজ পড়ে কেঁদে অঝর ধারায় বুক ভাসায় চোখের জলে। পাক বাহিনীর হাত থেকে কিভাবে যে বেঁেচ ছিলেন তা কারো কাছে কোন দিন বলতে চাইন না। এলাকার সবাই রহিমের মাকে বীরাঙ্গনা বলে ডাকে। রহিমের মার তাতে কোন কিছু আসে না। শুনে শুধু নিরবে চোখের জলে বুক ভাসায়। আর বলে কেন আমার মরণ হয়না, একবার মরতেও গিয়েছিল ইমনের মা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। আর সেই থেকে তাদের বাড়িতেই আশ্রয় হয় রহিমের মা’র। অনেকবার বাড়িতে স্থানীয় সাংবাদিকরা কিভাবে বেঁচে ছিলেন তার কাছে জানতে চাইলেও কোন কিছু বলেননি। এ নিয়ে ইমনের অনেক আগ্রহ আছে জানতে, তবে থাকলেও বলে না রহিমের মা।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে রহিমের মা বাড়ি পেচনের পুকুর পাড় থেকে রাতে খাবারের জন্য সবজি তুলতে গেছে। একা একা সবজি ক্ষেতে কাঁদছে আর বলছে কি যে করি ছেলেটা কে নিয়ে, মা সারাদিন স্কুল আর টেউশনি নিয়ে পড়ে থাকে, ছেলেটার খেয়াল রাখে না। আজ কলেজেও গেল না, দুপুরে কোন কিছু খেল না, সারাদিন ধরে ঘরের দরজা বন্ধ করে কি যে করছে খোদাই জানে। রহিমের মা সবজি তুলে নিয়ে বাড়ি এসে দেখে ইমন ঘর থেকে বের হয়েছে। হাতে একটি বই নিয়ে কোথায় যেন যাবে মনে হচ্ছে।
রহিমের মা বলল ইমন কই যাইবেরে বাবা?
চাচি শিমুলদের বাড়ি যাবো, আজকে তো কলেজে যাইনি তাই ক্লাসের পড়া গুলো জানতে হবে।
তারাতাড়ি ফিরে আসিস, না হয় তোর মা চিন্তা করবে।
চাচি একটি কথা বলি?
বলরে বাবা আমার অনেক কাজ আছে, রান্না বান্না করতে হবে। কি বলবি তারাতাড়ি বল?
আমি যে আজ কলেজে যাইনি তুমি মাকে কিšুÍ বলবে না, আর দুপুরে যে কোন কিছু খাইনি তাও বলবা না।
আচ্ছারে বাবা বলবো না, তবে তারাতারি বাড়ি ফিরে আসিস।
ঠিক আছে চাচী, আমার লক্ষী চাচী বলে রহিমের মার কপালে একটি চুমু খেয়ে শিমুলদের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল ইমন।
ইমনের চুমুর পরক্ষনেই রহিমের মার চোখ দিয়ে জল ঝড়তে লাগল। মনে হয়ে গেল রহিমের কথা আর মনে মনে বলতে লাগল আমার রহিম যদি বেঁচে থাকতো তাহলে আজ কতো বড় হতো। আল্লাহ তুমি আমার রহিমকে দেখে রেখো, চোখের পানি কাপড়ের আচঁল দিয়ে মুছছে আর বলছে আল্লাহ তুমি আমার রহিম আর তার বাবাকে দেখো রেখো। ততক্ষণে ইমনের মা ফাহিমা খাতুন চলে এসেছে।
উঠোনে পা রেখেই বলল রহিমের মা তোর আবার কি হলো?
রহিমের মার হুশ হলো ফাহিমা খাতুনের কথা শুনে। নারে বোন কিছু হয়নি ছেলেটার কথা মনে হলো।
তোকে না বললাম পুরনো কথা গুলো কোনদিন মনে করবি না
মনে কি সাধে করিরে বোন, স্বামী আর ৭ বছরের ফুট ফুটে সন্তানের চেহারা যখন চোখের সামনে ভেসে উঠে তখন চোখ দিয়ে এমনিতেই পানি চলে আসে।
কেঁদে কি হবে রহিমের মা। আমি পুরনো কথা গুলো মনে করতে চাই না, ১৮টি বছর ধরে বুকের মাঝে যে ভোজা নিয়ে বেঁচে আছি তা কারোর কাছে বলার মতো নয়। তুই আর কোনদিন পুরনো কথা গুলো মনে করবি না, কই আমিতো কোনদিন কাঁদিনি। ইমন যদি জানতে পারে সেই কথা গুলো, কি যে হবে তা কি তুই কোনদিন ভেবে দেখেছিস? তুই তো তোর রহিম কে হারিয়ে কাঁদিস। আর আমি যে কী যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে আছি তা কি তুই জানিস? সেই ২৫শে মার্চ কাল রাতের কথা মনে হলে নিজেকে নিজে শেষ করে দেওয়ার জন্য মনের মাঝে ইচ্ছা জাগে, পারিনা শুধু ইমনের জন্য। ওর তো কোন দোষ নেই। আমি ছাড়া ওর যে আর কেউ নেই বলে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে চলে গেল ফাহিমা খাতুন। রহিমের মা সবজি নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, ঘরের কোনে বাসা বাধাঁ চড়–ই পাখি গুলো কিচির মিচির শব্দ করতে লাগল। মসজিদ থেকে মাগরিবের আযানের ধ্বনি শোনা গেল।
রহিমের মাকে ফাহিমা খাতুন বলল এই রহিমের মা রান্না পরে করবি নে, আগে নামাজ পড়ে লও।
রহিমের মা সবজি আর কাটা শেষ করতে পারেনি, অর্ধেক রেখেই চলে গেল ওজু করার জন্য। ততক্ষণে ইমনও শিমুলদের বাড়ি পৌছে গেছে।
এই শিমুল…শিমুল বাড়িতে আছিস নি? বলে ডাক দিলো ইমন।
শিমুল তার রুম থেকে বের হয়ে অবাক হয়ে বলল আরে ইমন তুই! তাও আবার এই সন্ধ্যায় কিজন্য আসলি?
কেন আমার কি তোদের বাড়িতে সন্ধ্যায় আসা বারন আছে নাকি?
আরে না তা বলছি না, অনেকদিন পরে আসলি তো তাই।
কেমন আছিস?
নারো দোস্ত তেমন ভালো না।
কেন? কি সমস্যা তোর?
না তেমন কিছু না, তা পরে বললেও চলবে আগে ভিতরে চল।

ইমন শিমুলে পেচনে পেচনে ঘরে চলে গেল। ঘরে ঢুকে ইমন রীতিমত অবাক। শিমুলের পড়ার ঘরে মেয়ে। ঘরে দুটি চেয়ার রাখা একটিতে মেয়েটি বসে কি যেন লিখছে, মেয়েটির পাশে রাখা আরেকটি চেয়ার ফাঁকা। শিমুল ইমনকে লক্ষ করে বলল কিরে তুই বসবি না দাঁড়িয়ে থাকবি?
সাথে সাথে ইমন পালঙ্কে গিয়ে বসল। শিমুলও ইমনের সাথে পালঙ্কে বসে পড়ল।
এবার বল ইমন কি জন্য আসলি এই সন্ধ্যায় এতো রাস্তা হেঁঠে?
আসলাম আজকে কলেজে যাইনি, সামনে তো পরীক্ষা, নিয়মিত ক্লাসের পড়া শেষ না করতে পারলে সমস্যায় পড়ে যাবো, তাই তোর কাছ থেকে আজকের পড়া গুলো নোট করে নিয়ে যেতে আসলাম।
আরে দুস্ত আমি তো আজকে কলেজে যাইনি।
কি বলিস দোস্ত! তাহলে তো আমি আর আজকের পড়া জানতে পারবো না।
আরে সমস্যা নেই জানতে পারবি। এক কাজ কর তুই ইমার কাছ থেকে জেনে নে বলল শিমুল।
ইমা আবার কে?
ও তোকে তো পরিচয় করিয়ে দেইনি, ইমাকে দেখিয়ে বলল ও হচ্ছে আমার ছোট বোন ইমা। আমাদের সাথেই পড়ে। এতো দিন শান্তিপুর মামার বাড়িতে থাকতো। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করেছে। ও আজ কলেজ গিয়েছিল।
ও আচ্ছা বলে একটি বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইমন।
ইমা এ হচ্ছে আমাদের ক্লাসের একজন ট্যালেন্ট ছাত্র। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আমার হাইস্কুল জীবনের একমাত্র বন্ধু। যার কারনে আমি কলেজে বারান্দায় যেতে পেরেছি। শিমুল ইমনকে নিয়ে নানান প্রসংশা করতে লাগল।
শিমুল তুই কিন্তু আমাকে নিয়ে একটু বেশি বলে ফেলছিস বলল ইমন।
কিসের বেশি বললাম? তুই আমাকে সহযোগিতা না করলে আমি কি এসএসসি পার করতে পারতাম না।
শিমুল আছে দোস্ত এসব বিষয় এখন বাদ দেতো।
ঠিক আছে বাদ দিলাম। তুই ইমার কাছ থেকে পড়াগুলো নোট করে নিয়ে নে, আমি একটু আসছি।
শিমুল ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই ইমা ইমনকে বলল ভালো আছেন?।
হ্যা ভালো।
আপনি কেমন আছেন?
ভালো, এই নিন হাত বাড়িয়ে দিয়ে ইমনকে নোটখাতা দিল ইমা এবং বলল এই খাতায় আজকের পড়া সব নোট করা আছে আপনি নিয়ে যেতে পারেন। তবে কাল আমাকে কলেজে দিয়ে দিয়েন।
ধন্যবাদ। আমি আপনাকে কাল কলেজে দিয়ে দেব। আপনি আমাকে বাঁচালেন।
কেন খাতা না পেলে কি মরে যেতেন?
তা না
তবে কি?
তবে এই সন্ধ্যাবেলা মায়ের সামনে কি নিয়ে দাঁড়াবো তা নিয়ে খুব টেনশন হচ্ছিল। ঠিক আমি আজ আসি। কালকে আপনার সাথে ক্যাম্পাসে দেখা হবে আপনার খাতা নিয়ে। এই শিমুল আমি চললাম।
শিমুল বলল চল্ তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি বলে ঘর থেকে বের হলো। ঘর থেকে বের হয়ে শিমুল বলল এবার বল ইমন তোর লেখা পড়ার খবর কি?
তেমন ভালো নারে দোস্ত।
কেন কোন মেয়ের প্রেমে টেমে পড়লি নাকি?
আরে না, তাহলে হলে তো অবশ্যই তোকে জানাবো।
কিভাবে জানাবি বলতো তোর সাথে আমার কতো দিন পর দেখা হয়েছে?
অনেকদিন পর দেখা হয়েছে তা ঠিক। তবে আমিই তো অবশেষে তোর বাড়ি এসে দেখা করলাম, তুই তো কোনদিন গেলি না আমাদের বাড়িতে।
সময় পাইনারে দোস্ত তুই তো দেখতেই পারছিস নিয়মিত কলেজে যেতে পারছিনা, বাবা তো তার চেয়াম্যানি আর জনগণের খেদমত নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে বাবার ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত তাকতে হয়। যাবো নে তোর বিয়ের সময় দাওয়াত করলে। তুই কি যে বলিস দোস্ত আমার বিয়েতে তোকে দাওয়াত করবো না, তবে আর কাকে দাওয়াত করবো।
শুনে খুশি হলাম তোর বিয়েতে আমি দাওয়াত পাবো বলে।
ইমন হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল ঠিক আছে দোস্ত ৭টা বেজে গেছে যেতে অনেক সময় লাগবে। ঠিক আছে যা, কাল কলেজে গেলে দেখা হবে বলে চলে গেল শিমুল। ইমন র্নিজন মেঠে পথ ধরে ঝিঁ ঝিঁ পোকার আলোয় একা একা বাড়ির দিকে আসছে আর মনে মনে ভাবতে লাগল বৃষ্টির কথা। কতোই না ভদ্র একটি মেয়ে, এতো বড় লোকের মেয়ে কোন অহংকার নেই। যেই রূপ সেই গুণ। যেমন শিমুল ঠিক তেমনি তার বোনটি। ভালই হলো ইমার সাথে পরিচয় হয়ে। মাঝে মধ্যে সমস্যার কারণে কলেজে যেতে না পারলে অন্ততপক্ষে ক্লাসের পড়াটা তো জানার একজন মানুষ হলো। ইমার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ১ ঘন্টার রাস্তা ইমন হেঁটে চলে আসল টেরই পেলনা। বাড়ির উঠোনে এসে দেখে ইমনের জন্য তার মা বারান্দায় বসে আছে। ইমন তার মাকে দেখে মনে মনে বলে আজকে ফেসে গেলাম। আমার মনে হয় রক্ষা নেই। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুহাত উপরে তোলে মোনাজাত করল ইয়া আল্লাহ তুমি আমায় রক্ষা করো। ইমন মোনাজাত পড়ে শেষ করতে না করতেই ইমন….এই ইমন এদিকে আয় বলে কাছে ডাকল ইমনের মা?
মা কি বল
কোথায় গিয়েছিলে তুই?
শিমুলদের বাড়িতে, হাতের খাতাটি দেখিয়ে বলে এই সাজেশন্সটি আনতে।
শিমুল কে?
আমার কলেজে বন্ধু। কুসুমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসলাম তালুকদারের ছেলে।
ও আচ্ছা, তারাতারি হাত মুখ ধুয়ে খেতে আয়।
আসছি বলে ঘরে চলে গেল ইমন।
রহিমের কোথায় তুই ইমন আসছে টেবিলে তারাতারি খাবার দে?
আনছি আপা বলে রান্না ঘর থেকে জবাব দেয় রহিমের মা। ইমন তার রুমে প্রবেশ করে তাড়াহুড়ো করে জামাকাপড় পাল্টিয়ে টিউবওয়েল থেকে হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে চলে এসে বসেছে। ইমনের সাথে তার মা ও বসেছে। রহিমের মা টেবিলে খাবার এনে দিল। চাচি তুমি এখন খাবে না?
তুই খা রে বাবা আমি আরো পরে খাবো। রহিমের মা তুইও এখন খেয়ে নে বলল ফাহিমা খাতুন?
আপা তোমরা খাও আমি পরে খাবো নে বলে পানির জগ হাতে নিয়ে টিউবওয়েলে চলে গেল রহিমের মা। ইমন তোর লেখা পড়ার খবর কি?
ভালো মা।
পরিক্ষা কবে?
মাস খানেক পরে।
দেখ বাবা তোকে আমি কতো কষ্ট করে লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করে দেই, তুই যদি লেখাপড়ার প্রতি ভালোভাবে মন না দিস তাহলে আমার সারা জীবনে কষ্ট বিফলে যাবে। তুই ছাড়া আর জগতে কে আছে আমার?
মা তুমি কোন চিন্তা করো না। তুমি শুধু আমার জন্য দোয়া করো দেখবা আমি এসএসসি পরীক্ষার মতো এইচ এসএসসি পরীক্ষায়ও জেলার মধ্যে প্রথম স্থান করবো। সেই দোয়াই করি বাবা। শুধু জেলার মধ্যে প্রথম হইলে হবে না, এবার তোকে সারা দেশের মাঝে প্রথম হতে হবে। পানির জগ হাতে নিয়ে এস বলল রহিমের মা।
চাচি তুমি আর মা শুধু আমার জন্য দোয়া করো পরীক্ষায় আমি অবশ্যই ভালো করবো।
রহিমের মা আমি উঠলাম, তুই খেয়ে আমার রুমে আসিস বলে চলে গেল ফাতিমা খাতুন।
চাচি তুমি আমার সামনে খেয়ে নাও? আমি দুপুরে খাইনি বলে তুমিও তো দুপুরে খাওনি।
তুই কোন কিছু খাছ নি আমি কি করে খাইরে বাবা, তুই না খেলে আমি বা তোর মা কোন দিন কি খেয়েছি?
তা ঠিক তোমরা আমাকে অনেক আদর করো। তাই বলে কি আমি না খেলে তোমরাও খাবে না এটা কিন্তু ঠিক না চাচী। তুমি এখন আমার সামেনে খেতে বসো তার পর আমি এখান থেকে যাবো।
ঠিক আছেরে বাবা আমি তোর সামনেই খেতে বসছি বলে রহিমের মা বসে পড়ল।
ধন্যবাদ আমার লক্ষী চাচী তুমি খেয়ে নাও, আমি পড়তে গেলাম বলে ইমন চলে ইমন চলে গেল তার রুমে। পড়ার রুমে গিয়ে ইমার খাতাটি হাতে নিয়ে পালঙ্কে শুয়ে কি যে ভেবে একটি মুছকি হাসি দিল। অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পরে ইমন উঠে পড়ার চেয়ারটিতে বসে ইমার খাতা উল্টিয়ে পড়া গুলো বের করে নিজের বইয়ে মার্ক করতে শুরু করল। মার্ক করা শেষ হওয়ার পরে ব ইমার খাতাটি ভালো করে দেখে মনে মনে বলছে বৃষ্টি মনে হয় অনেক ট্যালেন্ট ছাত্রী, তা না হলে তার লেখা এতো সুন্দর হওয়ার কথা নয়। শিমুলটা কি না গাধা আর তার বোন ইমা কতো না ট্যালেন্ট। যাক এতো সব ভেবে সমসয় নষ্ট করে কোন লাভ নেই পড়াতে মন দেই বলে পড়তে শুরু করে। এদিকে রহিমের মা খাওয়া শেষ করে চলে যায় ইমনের মায়ের রুমে। আপা কি যেন বলবে বলেছিলে?
না তেমন কিছু না। ভাত খেয়েছিস তুই?
হ খেয়েছি।
সকালের রান্না করার মতো কিছু আছে নি?
লবণ আর তেল নেই।
সকালে রান্না করার আগে দোকান থেকে নিয়ে আসিস।
আপা দোকানে যেতে আমার মনে চাই না।
কেন?
তুমি কি জানিস না দোকানের কয়েকটি ছেলে আমাকে দেখলেই যোদ্ধের কথা জানতে চাই। মুক্তিযোদ্ধ কথাটি শুনলেই আমার সেই ভয়াবহ রাতের কথা মনে হয়ে যায় রে আপা, কি নির্মমভাবে ওরা আমার সামনে থেকে নিয়ে ফুটফুটে ছেলে আর স্বামীকে হত্যা করেছে আর আমাকে……. বলে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেঁদে ফেলে রহিমের মা।
এই শুরু করে দিলি আবার তোর কান্না। বিকালে কি বললাম, এখনই ভুলে গেলি। আমি কি তোর থেকে কম ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছি কই আমি তো কোনদিন কাঁদিনি। আপারে আমি যে ভুলতে পারিনা সেই রাতের কথা?
ভুলতে হবে, ভুলতে না পারলেও ভুলার চেষ্টা করতে হবে। যুদ্ধের স্মৃথি গুলো যতোদিন তোর মাথায় থাকবে ততো দিন তোর চোখের জল শুকাবে না।
চোখের জল তো আপা সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে এখন নতুন করে আর কিসের জল ঝরবে?
তুই এভাবে কাঁদলে তো মরে যাবি আর কাঁদিস না। কেঁদে কি কোন লাভ হবে।
মওে তো কবেই গেছি রে আপা এখন পড়ে আছে শুধু লাশটা, মাটি তো দুরের কথা যে লাশ কে কোন কাক পক্কিও গ্রহণ করবে না বলে চোখ মুছতে মুছতে রহিমের মা তার রুমের দিকে চলে গেল। ফাতিমা খাতুন রহিমের মা চলে যাওয়ার সাথে সাথে হারিকেনের আলোটা নিভিয়ে দিল ঘুমিয়ে পড়ার জন্য। কারণ সকালে তার টিউশনি আছে তাই তারাতারি ঘুম থেকে উঠতে হবে। ইমন ততক্ষণে নিদ্রায় বিভোর হয়ে গেছে। রহিমের মা ঘরের টিম টিম করে জ্বলে থাকা হারিকেনের আলোটা নিভিয়ে বিচানায় শুয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করে হে আল্লাহ তুমি আমার স্বামী সন্তানকে দেখে রেখো। তুমি ছাড়া ওদের যে আর কেউ নেই বলে ঘুমিয়ে পড়ে। সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে গ্রামের সহজ সরল মানুষ গুলো রাতের গভীরতায় নিরভে নিজেকে একাকার করে দিয়েছে। বাড়ির সামনের বড় জারুল গাছটি থেকে রাত দুপুরে পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে। পাখিটার করুণ ডাক শুনে মনে হয় কত সহ¯্র বছর ধরে তার সঙ্গিনীকে খুঁজছে আর গভীর রাতে নিরবে নির্ভৃতে দু’চোখের জল ঝরাচ্ছে। একটা সময় পাখিটিও নিজের সঙ্গিনীকে হারিয়ে করুণ সুরে ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে রাতের আধাঁরে সাড়া দিয়ে নিরবে নিস্তদ্ধ হয়ে যায়। চারদিকের মসজিদ থেকে ফজরের আযানের ধব্বনি ভেসে আসছে। আরামের ঘুম থেকে উঠে সৃষ্টি কর্তার ইবাদত করার জন্য আস্সালা তো খাইরুন মিনান্নার, আস্সালা তো খাইরুন মিনান্নার বলে মোয়াজ্জিন বিশ্ব মুসলিমদের কে ডাকছে। বাড়ি বাড়ি ভোরের ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরের কোন থেকে মুরগির কক ককার কক…. কক ককার কক ডাক শোনা যাচ্ছে। ফাহিমা খাতুন অন্ধকারেই বিছানা থেকে উঠে বারান্ধায় চলে এসে রহিমের মাকে ডাকতে লাগল, এই রহিমের মা? রহিমের আযান হয়েছে উঠে আয়?
আসছি আপা, তুমি বারান্দায় বসো, আমি তোমার ওযুর পানি নিয়ে আসতাছি বলে রহিমের মা অন্ধকার ঘর থেকেই জবাব দিল।
ইমন?
ইমন?
এই ইমন বলে ডাকছে ফাহিমা খাতুন?
একটু বিরক্ত হয়ে বলল কি যে করি ছেলেটা কে নিয়ে। ইমনের কোন উত্তর এলো না।
আপা এই নাও তোমার ওযুর পানি বলে একটি মগ দিয়ে পানি দিল রহিমের মা। দে তুই আমার রুমের হারিকেন টা জ্বালিয়ে?
তুমি ওযু করো আমি হারিকেন জ্বালিয়ে দিচ্ছি বলে রহিমের ফাহিমা খাতুনের রুমে গিয়ে হারিকেন জ্বালাল। ততক্ষনে ফাহিমা খাতুন ওযু করে তার রুমে চলে এসে বলল রহিমের মা তুই নামাজ পড়বি না?
পড়বো আপা। যা ওযু করে আয় আর ইমন কে ঘুম থেকে ডাক দিয়ে জাগিয়ে দে?
ঠিক আছে আপা আমি ইমনকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিচ্ছি বলে রহিমের মা চলে।
ইমন….
ইমন…
এই ইমন ঘুম থেকে উঠ বাবা পড়তে বসবি বলে ডাকছে রহিমের মা।
ইমন ঘুমো ঘুমো ভাবনিয়ে বলল উঠছি চাচী তুমি যাও।
রহিমের ওযু করে এসে দেখে ইমন ঘুম থেকে উঠেনি। একা একাই বলছে আগে নামাজটা পড়ে লই তার পরে ইমন কে জাগিয়ে দেব নে বলে রহিমের মা তার রুমে চলে গেল। ফাহিমা খাতন নামাজ পড়ে নামাজের বিছানায় বসে জিগির করছে। ফজরের নামাজ পড়ার আগে এবং পরে জিগির করা তার এক দুদিনে অভ্যাস নয়। যৌবনকাল থেকে ফাহিমা খাতুন ফজরের নামাজ পড়ে জিগির করতো। এখনও তার সেই অভ্যাস রয়েছে। আস্তে আস্তে করে রাতের অন্ধকারের মায়া কে প্রত্যাখান করে চাঁদ। দিনের ডাকে সাড়া দিয়ে সূর্যের দেখা মেলে। ততক্ষণে ইমনও ঘুম থেকে উঠে পড়ায় বসেছে।
ইমন ঘুম থেকে উঠেছিসরে বাবা?
হ্যা মা আমি তো কবেই ঘুম থেকে উঠেছি বলে জবাব দিল ইমন।
রহিমের মা তারাতারি নাস্তা তৈরী কর? আমার টিউশনি আছে সাড়ে সাতটায় বের হতে হবে, আট টার ভিতরে পৌছতে হবে।
আপা নাস্তা হতে বেশিক্ষণ লাগবে না তুমি বসো।
ইমন হাত মুখ ধুয়ে আয় আমার সাথে খেয়ে নেও?
আসছি মা। ইমন হাত মুখ ধুয়ে মায়ের পাশে এসে বসলো।
আজকে কলেজে যাবি না?
যাবো মা।
তাহলে আসার পথে লবন ও তেল নিয়ে আসিস এই নে ২০ টাকা লবন ও তেল কিনে যে টাকা থাকবে তা তুই খরচ করিস।
ঠিক আছে মা নিয়ে আসবো।
রহিমের মা নাস্তা নিয়ে চলে এলো। ফাতিমা খাতুন, ইমন ও রহিমের মা এক সাথে সকালের নাস্তা খেতে বসলো। বাড়ির সামনে দিয়ে ব্যস্ত কৃষকরা কাঁধে করে লাঙ্গল , জল এবং বাঁশের কাচা কঞ্চি হাতে নিয়ে গরুর পাল নিয়ে অবিরাম ছুটে চলেছে হাওরের দিকে। যেখানে আছে আগামির একটি সোনালি স্বপ্ন। ভোরের দোয়েল সুরেলা কন্ঠে গান ধরেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য যাচ্ছে। ফাহিমা খাতুন খাওয়া শেষ করে টিউশনির করার জন্য বের হয়ে গেল। ইমন ও নাস্তা শেষ করে চলে এলো পুকুর পাড়ে। পুকুর পাড়ের চারদিকে বেশ কয়েকটি শিমুল গাছে ফুল ধরেছে। দেখতে অনেক সুন্দর লাগে। তাই ইমন প্রতিদিন সকালে শিমুল গাছের নিচে চলে আসে। হঠাৎ করে ইমনের চোখ পড়লো পুকুর পাড়ে সিমানা বসে আছে। সিমানা হচ্ছে তাদের পাশের বাড়ির আবুল কালামের মেয়ে। সিমানা এবছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। স্কুল জীবনে সিমানার সাথে ইমনের মাঝে মধ্যে টুকটাক কথা হতো। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে আর দেখা সাক্ষাত হয়নি তাদের। সিমানা ইমনকে পাগলের মতো ভালোবাসে ইমন তা জানে, তবে না জানার ভান করে থাকে ইমন। সিমানা কোন দিন ইমনকে ভালোবাসার কথা মুখে বলেনি, তবে বিভিন্নভাবে বুঝারবার চেষ্টা করে সিমানা। কিন্তু ইমন সিমানাকে ভালোবাসে না। সিমানাকে পুকুর পাড়ে দেখে ইমন সিমানার কাছে এগিয়ে গেল। কাছে যাওয়ার পরেই সিমানা ইমন কে বলল কেমন আছিস ইমন?
ভালো।
তুই কেমন আছিস সিমানা?
বেশি ভালো না।
কেন?
এমনিতেই।
এমনিতেই আবার খারাপ থাকা যায় নাকি?
আমি বললাম তো এমনিতেই ভালো না।
সিমানা কি হয়েছে তোর বলবি তো?
কেন বলবো তোকে।
তুই আমার কে? যে তোকে আমার সব কথা বলতে হবে। তুই তো একজন স্বার্থপর মানুষ। তোর কাছে বলার দরকার নেই। তুই এসএসসি পাশ করার পরে সেই যে একদিন দেখা করেছিলে আর তো দেখা করলি না। তোর কাছে বললে কি লাভ হবে?
লাভ নাও হতে পারে, তবে আশা করি আমার কাছে বললে কোন ক্ষতি হবে না তোর।
ইমন আপাতত এই প্রসঙ্গ থাক। তোর কলেজের খবর কি বল?
তেমন ভালো না।
কেন?
এমনিতেই।
এমনিতেই আবার খারাপ থাকা যায় নাকি?
হুম থাকা যায় সিমানা।
ইমনের মুখের দিকে থাকিয়ে সিমানা বলল ও বুঝেছি তুই আমার প্রসঙ্গটি এখনও বাদ দেছনি, তাই আমার মতোই উত্তর দিলে।
তা না সিমানা, আমার বর্তমানে দিনকাল তেমন ভালো যাচ্ছে না।
ইমন তোর কি হয়েছে বলবি তো আমার কাছে? আমার সাথে এসএসসি পাস করার পর একদিনও দেখা করিসনি আমি অপরাধ করেছি তোর কাছে?
তুই আবার অপরাধ করবি কেন?
তাহলে আমার সাথে দেখা করিস না কেন?
সময় কোথায় তোর সাতে দেখা করার? সারাদিন কলেজে ক্লাস করে বিকেলে বাড়িতে এসে আবার ক্লাসের পড়া শেষ করতে হয়। যার কারণে আর তোর সাথে দেখা করতে পারিনা।
যাক এতোদিন তোর প্রতি আমার যে রাগ অভিমান ছিল তা আজ ভুলে গেছি তোর পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ দেখে। এবার বল তোর কি হয়েছে?
সিমানা তুই তো জানিস আমার বাবা নেই, মা সারাদিন কতো কষ্ট করে আমাদের পরিবার চালায়। কবে যে আমার লেখাপড়া শেষ হবে আর কবেই যে উর্পাজন করতে পারবো আল্লাহ জানে। মায়ের কষ্ট আর দেখতে ভালো লাগেনা।
তা নিয়ে এখন তোর চিন্তা করলে হবে না ইমন। সামনে তোর পরীক্ষা, তুই এইচএসসি পরীক্ষায় ও যদি এসএসসির মতো ভালো রেজাল্ট করতে পারিস তাহলে তোর চাকরির কোন অভাব হবে না বলল সিমানা।
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইমন বলল তা তো ঠিকই বলেছিস তবে সেই সময় অনেক দুরে রে সিমানা।
তাই বলে এখন তোর চিন্তা করলে হবে না ইমন, তোকে ভালো করে পড়াশোনা করতে হবে।
সিমানা এখন এসব কথা থাক, তার আগে বল হঠাৎ করে এতো সকালে তুই এই পুকুর পাড়ে কেন?
তোকে দেখবো বলে?
আমাকে দেখবি মানে?
আমার কি রূপ দেখা দিয়েছে নাকি?
ইমন তুই কোনদিন আমাকে আর বুঝলি না।
কেমনে বুঝবো আমি তোকে, তোকে যে বুঝার মতো আমার বয়স হয়নি এখনও।
ইমন তুই কি আমার সাথে সবসময় ফাইজলামি করবি?
কেন আমার কথা কি তোর কাছে ফাইজলামি মনে হচ্ছে নাকি?
না তোর কথা গুলো আমার কাছে মধুর মতো লাগছে। ইচ্ছে করছে তোর কথা গুলো যতœ করে তুলে রাখতে যাতে সময় পেলেই তোর এই মিষ্টি কথা গুলো শুনতে পারি। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয় তোর কথা গুলো যতœ করে রাখার কোন ব্যবস্থা নেই।
সিমানা তুই সবসময় আমার সাথে মসকরা করা ছাড়া কি থাকতে পারিস না?
কেন আমি কি তোর সাথে মসকারা করেছি নাকি?
না তুই আমার সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছিস। যাক সিমানা অনেক দিন পর তোর সাথে দেখা হলো, তোর পড়ার খবর কি?
আছে এক রকম।
এক রকম মানে?
তোর মতো তো এসএসসিতে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ট হতে পারবো না, তবে কোন মতে পাশ করতে পারলেই সুভাগ্য।
দেখ সিমানা তুই এবার এসএসসি পরিক্ষা দিবি এখন তোকে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে হবে।
এতো বেশি পড়া লাগবে না, কোন মতে পাশ করলেই হবে।
তোর যা খুশি তুই তাই কর, তুই তো আমার কথা শুনবি না?
কেন শুনবো তোর কথা তুই কি আমার কথা কোন দিন শুনেছিস?
সিমানা তুই কি কোন দিন বদলাবি না?
কেন কি হয়েছে?
আমাকে দেখলেই তোর ঝগড়া করতে মন চাই কেন?
থাক তোর এই প্রশ্নের উত্তরটি না হয় আজ দিলাম না। অনেকদিন পরে দেখা হলো। এটাই আমার সুভাগ্য।
কথা বলতে বলতে কখন যে সকাল আটটা বেজে গেছে তারা কেউ বলতে পারে না। হঠাৎ ইমনের ঘড়িতে আটটার এলাম বেজে উঠলো। সিমানা বলল ইমন আটটা বেজে গেছে স্কুলে যেতে হবে।
ঠিক আছে স্কুলে যা আমিও কলেজে যাবে।
ইমন বিকালে কি তোর সাথে দেখা করা যাবে?
না, বিকালে আমি খেলতে যাবো।
আমি আরও ভেবেছিলাম তুই বিকালে এখানে আসবে। বড় করে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিমানা বলল ঠিক আছে কাল সকালে কিন্তু এখানে আমি আসবো মনে থাকে যেন। ইমনও বাড়িতে চলে এলো। বাড়িতে আসতেই রহিমের মা বলল কিরে বাবা আজও কি কলেজে যাবি না?
যাবো চাচী।
তাহলে কবে গোসল করবি আর কবে যাবি?
এই তো গোসল করেই চলে যাবো। ইমন কলেজে চলে এলো। কলেজে এসে খুঁজতে লাগল ইমা কে। অনেক্ষণ ধরেই ইমাকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে শহীদ মিনারে পাশে বন্ধুদের সাথে বসে আছে। বন্ধুরা অনেকে অনেক কথা বললেও ইমন আছে অন্য জগতে, সে মনে মনে ভাবছে বৃষ্টি কি আজ কে কলেজে আসেনি। কলেজে আসবে না তাহলে আমাকে কাল কেন বলেছিল আজকে কলেজে আসবে। যাক না আসলে কি আর করা যাবে খাতাটি বাড়িতে দিয়ে আসবে হবে। ঘন্টা পড়েছে ক্লাসের সময় হয়েছে। ইমন ক্লাস রুমে চলে আসলে। ক্লাস রুমে এসে এক দৃষ্টিতে শিক্ষকের কথা শুনছে, বৃষ্টিকে খাতা দেওয়ার কথা আর মনে নেই। ইমন ক্লাস রুমে প্রবেশ করার সময় ইমা ইমনকে দেখেছে। তবে ইমন ইমাকে দেখেনি। ইমা বার বার ইমনের দিকে থাকাচ্ছে আর মনে মনে বলছে আমাকে কি দেখেনি। না আমার নোটখাতা আনেন নি। আনলে তো আমাকে ক্লাসে খুঁজার কথা, সে তো ক্লাসে এসে মেয়েদের দিকে তাকালোই না। মনে হয় আমার নোটখাতা সাথে আনে নি। ক্লাসের সময় শেষ। ঘন্টা পড়েছে। ঘন্টার শব্দে ইমার খেয়াল এলো সে তো ইমন কে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ক্লাসের সময় শেষ করে ফেলেছে। টিপিন খাওয়ার জন্য সবাই বের হয়েছে। ইমনও বন্ধুদের সাথে বের হয়েছে। বন্ধুরা সবাই ক্যান্টিনে দিকে এগিয়ে গেল ইমন যাইনি, ইমা কে খুঁজার জন্য রয়ে গেছে। হঠাৎ করে ইমাকে ইমন দেখতে পেল বান্ধবীদের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ইমাকে দেখতে পেয়ে ইমন ইমার সামনে গিয়ে বলল ভালো আছেন?
জ্বি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
হ্যা ভালো আছি। আমি আপনার নোটখাতা নিয়ে সেই কবে থেকেই আপনাকে খুঁজছি, তবে আপনার দেখা পাচ্ছি না।
কেন আমি তো ক্লাস রুমেই ছিলাম।
তাই নাকি আমি তো আপনাকে দেখিনি বলল ইমন?
আপনাকে আমি ক্লাস রুমে দেখেছি। আপিন তো ক্লাসে প্রবেশ করে মেয়েদের দিকে থাকান ওই নি আমাকে দেখবেন কি করে, আমি তো আর ছেলেদের সাথে বসেনি। ইমার এরকম কথা শুনে ইমন এতোগুলো মেয়েদের সামনে একটু লজ্জিত হয়ে বলল আমি ক্লাস রুম থেকে আপনার নোটখাতটি নিয়ে আসছি ৫মিনিট অপেক্ষা করুন।
আমিও ক্লাস রুমে যাবো।
চলুন যাওয়া যাক।
ইমন ক্লাস রুমে গিয়ে ব্যাগ থেকে নোটখাতাটি বের করে ইমার হাতে দেওয়ার সময় ইমার চোখে চোখ পড়লো। চোখে চোখ পড়তেই পরক্ষনেই ইমা কে ভেবে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল ইমন। ভাবতে লাগল এতো সুন্দর, ভদ্র একটি মেয়ে, তবে তার মধ্যে কোন রকম অহংকার নেই। বৃষ্টি হাতে নোটখাতা নিয়ে একটু ছোট্র করে কাশি দিল। ইমার কাশির শব্দে ইমনের কল্পনার ঘোর কাটলো। ধন্যবাদ আপনাকে গতকাল নোটখাতাটি দেওয়ার জন্য।
আপনাকেও ধন্যবাদ সময় মতো আমার নোটখাতাটি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।
ঠিক আছে ইমা আমি এখন আসি বলে ইমন বের হয়ে গেল।
ইমনকে আস্তে করে ডাক দিল ইমা?
ইমন পেচনে ফিরে থাকিয়ে বলল কিছু বলবেন?
জ্বি আপনি কি ক্যান্টিনে যাবেন?
হ্যা ক্যান্টিতে যাবো। কেন আপনার কিছু লাগবে কি?
হ্যা লাগবে। ইমা একটি ১০০ টাকার নোট তার হাতের মুটি থেকে বের করে বলল ু যদি কিছ মনে না করেন তাহলে আমাকে একটি কলম এনে দেন।
কিছু মনে করবো কেন। কলম আনা তো আর কোন ভোজার কাজ নয় বা সাত সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে না বলে ইমন ইমার হাত থেকে ১০০ টাকার নোটটি নিয়ে চলে গেল। ইমন টাকা নিয়ে ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে ইমাকে নিয়ে। একদিনের দেখাতেই ইমা ইমনের কাছে কতো অধিকার করে নিয়েছে। মনে হচ্ছে ইমা অনেক দিনের চেনা। ইমন যে ইমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে ইমনের বন্ধু সিয়াম দেখেছে। তবে ইমন সিয়ামকে দেখেনি। সিয়াম ইমনকে দেখার পরই সাথে সাথে ক্যান্টেনে চলে গেল। ইমন ক্যান্টিনে যাওয়ার পরই সিয়াম বলল দোস্ত এদিকে আয়?
কিরে সিয়াম বলতো কি?
কিছু খাওয়াস না দোস্ত, তোর কাছে দেখলাম একশ টাকার একটি টাটকা নোট আছে। সিয়ামের এ কথা শুনে ইমন অবাক হয়ে গেছে। কারণ ইমন ইমার কাছ থেকে কলম এনে দেওয়ার জন্য যে টাকা নিয়েছে সিয়াম তো দেখেনি, তবে সিয়াম জানলো কিভাবে? নিজেকে প্রশ্ন করলো ইমন। দোস্ত আমার কাছে একশ টাকার নোট আছে? তুই কিভাবে জানলি
তার আগে বল তোর কাছে একশ টাকার নোট আছে কিনা?
হ্যা আছে দোস্ত। তবে তা আমার নয়। আমি জানি একশ টাকাটা তোর নয়।
দোস্ত তুই এতো কিছু জানলি কি করে?
তুই যখন একটি মেয়ের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছিস তখন আমি তোর পিচনে ছিলাম। তুই টাকাটা নেওয়ার সাথে সাথেই আমি ক্যান্টিতে চলে এলাম তুই আসার আগে। ইমন মুচকি হেসে বলল ও তাই বুঝি, আমি আরো ভাবছি ইমা মনে হয় তোর কাছে বলেছে।
ইমা কে?
আরে ইমাকে কি তুই চিনিস না?
না আমি তো ইমাকে চিনি।
আরে দোস্ত আমি যার কাছ থেকে কলমের জন্য একশ টাকার নোটটি নিয়েছিলাম সেই মেয়েটিই ইমা।
মেয়েটির নাম কি ইমা?
হ্যা দোস্ত মেয়েটির নাম ইমা। তোর কি নাম নিয়ে কোন সন্ধেহ আছে নাকি?
আরে না তা থাকবে কেন?
তাহলে আমার আর কি?
আরো দোস্ত যেমন চেহারা তেমন নাম মেয়েটির। তাছাড়া…
তাছাড়া কি?
তোর নাম ইমন আর মেয়েটির নাম ইমা কতো মিল তোদের নামের মাঝে।
তাতে কি হয়েছে?
আওে হয়নি, তবে খুব শিঘ্রই হবে কিছু একটা।
ঠিক আছে যখন হকে, তখন দেখা যাবে এখন এসব বাদ দে।
বাদ দেব তার আগে বল দোস্ত তুই এই সুন্দরী মেয়েকে কিভাবে পটালে?
পটালাম মানে বুঝলাম না?
বুঝলি না, মেয়েটির সাথে কিবাবে প্রেম করলি?
আরে দোস্ত মেয়েটির সাতে কোন প্রেম টেম এসব কিছুই নয়।
তাহলে পরিচয় হলো কিভাবে?
আমি তার কাছ থেকে গতকালের ক্লাসের পড়ার নোটখাতাটি নিয়েছিলাম। আর সেই খাতাটি দেওয়ার জন্যই দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম।
তুই যাই বলিস দোস্ত মেয়েটি কে কিন্তু তোর সাথে হিব্বি লাগছিল। আচ্ছা বলতো দোস্ত মেয়েটির বাড়ি কোথায়?
আরে ইমা বৃষ্টি হচ্ছে কুসুমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসলাম তালুকদারের মেয়ে।
এই মেয়েকে কোন দিন কলেজে দেখেনি তোর সাথে প্রথম পরিচয় হলো কিভাবে?
ইমার বড় ভাই শিমুল তালুকদার তো আমার ক্লাসমেট। শিমুল আর আমি একই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছি। শিমুল তো বর্তমানে আমাদের কলেজেই পড়ে। সিয়াম বলল তার মানে ইমা তোর পূর্ব পরিচিত?
আরে না গতকাল শিমুলের কাছে গিয়েছিলাম ক্লাসের পড়া জানতে, সেখানেই পরিচয় হয় ইমার সাথে। শিমুল বলল তার ছোট বোন ইমার আমাদের সাথেই ভর্তি হয়েছে। পরে সে আমাকে তার নোটখাতাটি দেই। আর এই নোটখাতা ফেরত দিতে গিয়েই তোর কাছে আমার ইমাকে নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে হচ্ছে।
ইমা এসএসসি পাস করেছে কোথায় থেকে?
তার মামার বাড়ি শান্তিপুর থেকে।
তোকে অনেক ধন্যবাদ দোস্ত, তুই কষ্ট করে আমার কাছে বৃষ্টির সকল পরিচয় দেওয়ার জন্য। তাই তোর কাছ থেকে আজ আর কিছুই খেলাম না।
তরে আমি কিছু খাওয়ালে তো।
আমাকে কিছু খাওয়াতে হবে না দোস্ত, তবে তোকে আমি একটি টিপিন ক্যাক দিলাম।
ধন্যবাদ দোস্ত আমি তোর দেওয়া টিপিন ক্যাক সাদরে গ্রহণ করলাম বলে হাতে নিল ইমন।
ধন্যবাদ তোকে টিপিন ক্যাক সাদরে গ্রহণ করার জন্য। আর তারাতারি কলম নিয়ে চলে যা, তা না হলে বৃষ্টি তোকে ভুল বুঝবে।
একটি মুচকি হাসি দিয়ে ইমন বলল ঠিক আছে দোস্ত তাহলে আসি। ইমন কলম নিয়ে ক্লাস রুমের ভিতরে গিয়ে দেখে ইমা একা একা তার বেঞ্চে বসে আছে। কাছে যেতেই বৃষ্টি বলল আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ কেন?
এই যে আপনি অনেক কষ্ট করে আমার জন্য কলম নিয়ে এলেন এজন্য।
আরে এখনও তো আপনার কলম হাতে দেইনি, তার আগেই আমাকে ধন্যবাদের সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছেন।
ইমা একটু লাজুক হাসি দিয়ে বলল আপনি অনেক সুন্দরভাবে কথা বলেন।
এই নিন আপনার কলম আর টাকা।
ইমা হাত বাড়িয়ে দিয়ে কলম ও টাকা নিল। ইমা কলম আর টাকা নেওয়ার পরে ইমন বলে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আমাকে আবার অনেক ধন্যবাদ কেন?
আপনি যে গতকাল আমাকে নোটখাতা দিয়েছিলেন তাই।
ও তাই হাসি দিয়ে ইমা বলল আপনিও তো আমাকে ধন্যবাদের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছেন। আর কয়েকটি ধন্যবাদ দিলে ধন্যবাদের সাগরের ভুবে মরবো। টিপিনের সময় শেষ ঘন্টা পরলো। সাথে সাথেই ক্লাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রভাষক ইসমাইল স্যার এসে বলল আজ তোমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ক্লাস আর হচ্ছে না কলেজ ছুটি হয়ে যাবে এখনই, তবে পরের সপ্তাহ ক্লাস অবশ্যই হবে সবাই প্রিপারেশন নিও এসো বলে ক্লাস থেকে ইসমাইল স্যার চলে গেল। স্যার চলে যাওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল হুই হুল্লোড় আর শিষ দেওয়া। ঘন্টা পড়লো ছুটির। সবাই যার যার মতো করে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে চলে গেল। ইমা ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে মনে মনে ইমন কে খুঁজছে। তবে ইমন কে পেল না। কারণ ইমা বান্ধবিদের সাথে কথা বলে ক্লাস রুম থেকে বের হওয়ার আগেই ইমন কলেজ ক্যাম্পাস প্রস্তান করেন। ইমন ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে কলেজের গেইটে যাওয়ার পরে আবার দেখা হয়ে গেল সিয়ামের সাথে। সিয়াম ইমনকে দেখে বলল কিরে দোস্ত ইমা কোথায়?
ইমা কোথায় আছে আমি কিভাবে বলবো?
কেন আজ তো তুই ইমা কে নিয়ে সারাদিন সময় কাটালে আমি তো ভাবছি ছুটির পরে ও ইমা কে নিয়ে কোথাও যাইবে।
শুন সিয়াম বৃষ্টির সাথে গতকালে পরিচয় মাত্র, আর আজকে কলেজে একটু খানি কথা হয়েছে। তাতে তুই এতো মসকারী করছিস কেন?
মসকারী নারে দোস্ত এমন সুন্দরী একটি মেয়েকে নিয়ে কি কেউ মসকারী করতে পারে? আর আমি তো মোটেও মসকারী করছি না।
দেখ সিয়াম কলেজের মধ্যে তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। সবাই বৃষ্টিকে আর আমাকে নিয়ে যাই ভাবুক না কেন আমি আশা করি তুই নেগেটিভ কোন কিছু ভাববি না।
ঠিক আছে দোস্ত আমি আর কোনদিন তোকে আর ইমা কে এক সাথে দেখলে কোন কিছু বলব না। তবে একটি কথা বলি দোস্ত ইমা কে কিন্তু তোর সাথে সেই রকম মানেয়েছিল।
আচ্ছারে দোস্ত আমাকে সালমান শাহ’র মতোই লেগেছিল, আপতত এই বিষয় সমাপ্ত ঘোষনা করা হলো বলে ইমন বলল আমি চলি।
ঠিক আছে দোস্ত কাল কলেজে আসলে দেখা হবে বলে ইমনের কাছ থেকে বিদায় নিল সিয়াম। ইমন বাড়িতে চলে আসলো। কাধ থেকে কলেজ ব্যাগটি টেবিলের উপর রেখে কলেজের পোশাক বদল করে না করেই বিছানায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়লো। রহিমের মা ইমনের রুমে এসো দেখে ইমন পোশাক বদল না করেই শুয়ে আছে। ইমনের মাথার কাছে এসে বসলো রহিমের মা। বসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল কিরে বাবা তোর কি হয়েছে?
না চাচী আমার কিছু হয়নি। তাহলে তুই পোশাক বদল না করেই শুয়ে পড়লি কেন?
চাচী অনেক রাস্তা আজ হেঁটে এসেছি তাই একটু রেস্ট নিচ্ছি। তুমি টেবিলে খাবার দেও আমি হাত মুখ ধুঁয়ে আসছি।
ঠিক আছে বাবা এখনই খাবার দিচ্ছি বলে রহিমের মা চলে গেল। হাত মুখ ধুঁয়ে ইমন খাবার খেতে এল। রহিমের মা খাবার দিয়ে বলল তুই খেয়ে নে রে বাবা আমি উঠোন থেকে লাকড়ি নিয়ে রাতের জন্য রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে।
ঠিক আছে চাচী তুমি যাও আমি খেয়ে নেব। ইমন খাবার খেয়ে একটি বই হাতে নিয়ে চলে গেল পুকুর পাড়ে। পুকুর পাড়ের সবচেয়ে বড় সুপারি গাছটির নিচে গিয়ে বসল ইমন। বই খোলে পড়তে বসলো কিন্তু পড়ায় মন বসছে না। মনে হয়ে গেল ইমার ও সিয়ামের কথা। দুজনের কথা চিন্তা করতে করতে কল্পনায় চলে গেল ইমন। কল্পনায় দেখছে ইমা ইমনকে বলছে আপনি কলেজ ছুটির পর আমার সাথে দেখা করলে না কেন?
ইমন উত্তর দিল ছুটির পর আমার খুব তাড়া ছিল তাই আমি চলে এসেছিলাম।
কেন আপনি কি কিছু বলবেন আমাকে?
জ্বি আপনার সাথে একটি কথা ছিল।
ঠিক আছে এখন না হয় বলে ফেলুন আমি শুনি। ইমন ইমা কে এই কথা বলার সাথে সাথেই ইমনকে পেচন থেকে ডাক দিলো সিমানা এই ইমন তুই না বলেছিলে বিকালে এখানে আসবি না?
সিমানার কথা শুনে ইমনের কল্পনা ভেঙ্গে গেল। ইমন একটু তৎমত করে বলল সিমানা তুই?
কেন এই সময় এখানে অন্য কেউ আসার কথা ছিল নাকি?
একটু বিরক্ত হয়ে ইমন বলল না।
বড় একটি নিঃশ্বাস ফেলে সিমানা বলল যাক বাবা বাঁচা গেল। আমি তো ভেবেছিলাম অন্য কারোর জন্য অপেক্ষা করছিস।
দেখ সিমানা সব সময় ফাজলামি করা আমার ভালো লাগে না।
ঠিক আছে বাদ দিলাম। এখন বল তুই এই সময় এখানে কেন?
ইমন বলল আমি প্রতিদিনই এখানে আসি। তবে তুই কেন?
আমি এসেছি তুই যে সকালে বলেছিলে তুই বিকালে আসবি না, আমি তোর কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য এসেছি।
তোর আসার আর সময় হলো না? একটু পরেই আসতি। তুই এমন সময় আমাকে ডাক দিলে যে আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।
তাই নাকি? বলল আচ্ছা বল আমি তোর কি এমন ক্ষতি ফেলেছি করেছি এই সময় এসে?
আমি একটি স্বপ্ন দেখছিলাম ছিলাম তুই ডাক দিয়ে আমার স্বপ্নকে তো দিলে ভেঙ্গে।
সিমানা একটি বড় করে হাসি দিয়ে বলল সারা জীবন শুনে এসেছি মানষ স্বপ্ন দেখে ঘুমিয়ে আর আজ তোর কাছে জানতে পারলাম তুই স্বপ্ন দেখিছ জেগে। ভালোই হয়েছে তোর কাছে এসে আজ আমার নতুন একটি অভিজ্ঞতা হলো।
দেখ সিমানা তুই কিন্তু আমার কথাটি নিয়ে মসকারী করছিস। তুই ভালো করেই জানিস আমি মসকারী একদম পছন্দ করি না।
মসকারী করবো না তো কি করবো। মানুষ কি কখনো জেগে সপ্ন দেখতে পারে না কি?
হ্যা দেখতে পারে। সপ্ন সেটাই যেটা মানুষ জেগে জেগে দেখে আর ঘুমিয়ে যেটা দেখে সেটা হলো শুধুই দুঃসপ্ন।
তা কিন্তু ঠিক নয় ইমন।
তাই ঠিক।
আচ্ছা এসব কিছু বাদ দে ইমন তোর সাথে বির্তকে যেতে চাই না।
বাদ দিলাম। এখন বল সিমানা তুই এখানে আসলি কেন?
আমি তো বললামই তোর কথা সত্যি কি না যাচাই করতে।
আমি তোর কাছে বলেছিলাম বিকালে খেলায় যাবো, কিন্তু যাইনি কারণ আজ কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ক্লাস হয়নি তাই ভাবলাম খেলায় না গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পড়া গুলে পড়ে শেষ করে ফেলি।
তাই নাকি?
জ্বি মেডাম তাই।
ভালো। আচ্ছা বলতো তুই জেগে জেগে কি স্বপ্ন দেখছিলি?
স্বপ্ন আর দেখতে পেলাম কোথায় তার আগেই তো তুই এসে দিলি সব ভেঙ্গে।
বুঝেছি তুই আমার কাছে বলবি না।
ধন্যবাদ আপনাকে বুঝার জন্য আমি যে আপনাকে স্বপ্নের কথা বলব না। তাছাড়া সপ্ন কারো কাছে বলতে নেই বললে স্বপ্নের ক্ষতি হয়।
আচ্ছা আমি তোর কাছে কখনো স্বপেরœ কথা জানতে চাইবো না।
আবারও ধন্যবাদ।
ঠিক আছে ইমন সন্ধ্যা হয়ে গেছে আমি গেলাম বেঁচে থাকলে কাল সকালে এখানে দেখা হবে বলে সিমানা চলে গেল।
এই সিমানা তুই কিন্তু আবার রাগ করিস না বলে একটি মুছকি হাসি দিল ইমন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। রাখালেরা গরুর পাল নিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে। পাখ-পাখালিরা কিচির মিচির শব্দ করে সারাদিন ক্লান্তি দূর করে ঘরে ফিরছে। আশে পাশের মসজিদ থেকে আযানের ধব্বনি শোনা যাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি নিভু নিভু করে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলেছে। ইমন বাড়িতে চলে গেল। ইমনের মা বলল ইমন লবণ আর তেল এনেছিলে?
হ্যা মা এনেছিলাম।
আচ্ছা যা বাবা হাত মুখ ধুঁয়ে পড়ায় বস।
ইমন তার রুমে গিয়ে বিছানায় একটু হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লো। শুয়ে ঘরের কোনে রাখা পুরনো একটি ছবির দিকে থাকিয়ে মনে মনে ভাবছে ইমা আমাকে কি বলতে চাইছিলো। মনে হয় আমাকে খুবই গুরুত্ব পূর্ণ কথা বলতো। যা করলো সিমানা, আসার আর সময় পেল না। যদি সিমানা আর একটু পরে আসতো তাহলে মনে হয় ইমার কথাটি বলে ফেলতো। যা হবার তো হয়েছে। দেখি কালকে কলেজে ইমা কিছু বলে কি না। এই সিমানাটাকে নিয়ে দেখা যাচ্ছে আমি একটি সমস্যায় আছি। কি করে যে সিমানাকে দূরে রাখবো বুঝতি পারছি না। যাক এসব নিয়ে চিন্তা করলে আর কি লাভ হবে পড়ায় বসি বলে ইমন বিছানা থেকে উঠে পড়ায় বসে পড়লো। ইমনের মা নামাজ পড়ে এসে বলল ইমন টেবিলে খাবার খেতে আয়?
আমি ৫মিনিটের মধ্যেই আসছি মা। তুমিটেবিলে গিয়ে বস।
ইমনের মা চলে গেল। ইমন পড়ার টেবিল থেকে উঠে খাওয়ার টেবিলে জন্য চলে গেল। রহিমের মা খাবার এনে দিলো টেবিলে। ইমন খুব তারাতারি খাবার খেয়ে পড়তে চলে এলো। পড়ার টেবিলে বসে পড়ছিল হঠাৎ করে স্মরণ হলো সিয়াম যে বলেছিল ইমন কে সালমান শাহ আর ইমা কে শাবনুরের মতো মনে হয়েছিল তারা যখন একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল। এই কথা চিন্তা করে ইমন একটু মুছকি হাসি দিলো আর গুণ গুণ করে গান গাইতে লাগল। রাত প্রায় সাড়ে বারোটায় পড়া শেষ করে ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়লো। বিছানায় শুয়ে ইমন ঘুমানোর চেষ্টা করলে ঘুম আসছে না। একবার পালঙ্কের ডান পাশে আরেকবার বাম পাশে শুয়ে চেষ্টা করেও চোখে ঘুম আসছে না। একবার মনে হয় ইমার কথা আরেকবার মনে হয় সিয়ামের কথা। বিছানার এপাশ আর ওপাশ করতে করতে ফজরের আযানের ধব্বনি শোনা যাচ্ছে। ইমন আযানের শব্দ শোনে বলছে আজ আমার কপালে ঘুম আর পড়া কোনোটাই নেই। সব কেড়ে নিয়েছে বৃষ্টি আর সালা সিয়াম এই কথা বলে ইমন বিছানা থেকে উঠে হাত মুখ ধোঁয়ার জন্য টিউবওয়েলে চলে গেল। টিউবওয়েল থেকে হাত মুখ ধোঁয়ার পরে পড়তে বসে উচ্চ স্বরে পড়া শুরু করে দেন। ইমনের পড়ার আওয়াজের শব্দে ইমনের মা ঘুম থেকে উঠে এসে দেখে ইমন পড়ছে। ইমনের মা যে ইমন কে দেখেছে ইমনের মা মনে করে ইমন তাকে দেখেনি। তবে ইমন ঠিকই দেখেছে। না দেখার ভান করে রয়েছে। ইমনের মা ইমনকে পড়া শোনা অবস্থায় দেখতে পেয়ে অনেক খুশি কারণ প্রত্যেকদিন রহিমের মা ইমনকে ঘুম থেকে জাগায়। ইমন মনে মনে বলছে যা ভালোই হলো মা আমাকে পড়তে দেখেছে। আমি যে পড়ার জন্য বসেও সারা রাতে এক লাইন পড়তে পারলাম না। তা তো আর মা বলতে পারে না। রহিমের মা ঘুম থেকে জেগে প্রথমেই ইমনের রুমের দিকে চলে এলো। রহিমের মা ইমনের রুমে এসে তো রীতিমতো অবাক হলে, কারণ ইমন কোন দিন এতো রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠেনি। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে রহিমের মা বলল কিরে বাবা ইমন আজ দেখি আমি তোকে ঘুম থেকে জাগাবার আগেই তুই ঘুম থেকে উঠে গেলি?
চাচী প্রতিদিন একই টাইমে উঠতে উঠতে অভ্যাস হয়ে গেছে তো তাই উঠে পড়লাম।
ও আচ্ছা। তুই মন দিয়ে পড় বাব আমি নামাজ পড়ে তোর জন্য আজ রুটি বানিয়ে নিয়ে আসবো।
সত্যি বলছো চাচী?
একদম সত্যি বলছি।
আমার লক্ষী চাচী তারাতারি রুটি নিয়ে এসো কিন্তু।
ঠিক আছে বাবা নিয়ে আসবো তুই মন দিয়ে পড় বলে রহিমের মা চলে।
ফাহিমা খাতুন ওযু করছে বারান্দায় বসে। ওযুর পানির গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে উঠোনোর কোণের পেয়ারা গাছটির গুড়িতে। পাশের বাড়ি থেকে মোরগের উচ্চ স্বরে কক কক ককার কক ডাক শোনা যাচ্ছে। ফাহিমা খাতুন ওযু শেষ করে নামাজ পড়তে ঘরে চলে গেল। রহিমের মা ওযুর জন্য টিউবওয়েলে হাতে করে একটি মগ নিয়ে যাচ্ছে আর বলছে আল্লাহ জানিনা আমার রহিম আর ওর বাবা এখন কোথায় আছে। আল্লাহ ওরা যেখানেই থাকুক না কেন তুমি ভালো রেখো। টিউবওয়েল থেকে ওযু করে রহিমের মা নামাজ পড়তে তার রুমে চলে গেল। ইমন বসে ক্লাসের পড়া না পড়ে উপন্যাস পড়ছে। ইমনের আবার উপন্যাস ও কবিতার বই পড়তে খুব ভালো লাগে। তবে সচাচর উপন্যাস পড়ে না। উপন্যাস পড়ে বাৎসরিক পরীক্ষার পরে যে সময়টা থাকে সে সময়টায়। তবে আজ উপন্যাস পড়ছে পাঠ্যবই পড়তে মন চাইছে না বলে। রহিমের মা রুটি আর চেপা সুটকির বর্তা নিয়ে ততক্ষণে হাজির ইমনের রুমে। রুমে প্রবেশ করে দেখে ইমন উপন্যাস পড়ছে। রহিমের মা হাতে রুটি নিয়ে বলল কিরে বাবা তুই তোর বই না পড়ে এটা কি পড়িস?
চাচী আজ বই পড়তে ভালো লাগছে না তাই উপন্যাস পড়ছি। দেখি উপন্যাসটি পড়ে পড়ায় মন বসে কি না। তাছাড়া উপন্যাসটি অনেক দিন আগে কিনেছিলাম।
না বাবা এসব বই এখন পড়লে তোর পড়াশোনা ভালো হবে না। তোকে যেভাবেই হোক ক্লাসের পড়া নিয়মিত পড়তে হবে।
ঠিক আছে চাচী এই তোমার সামনে উপন্যাস রেখে দিলাম। এখন তুমি খুশি হলে তো?
রহিমের মা একটি মিষ্টি হাসি দিলে বলল এখন আমি অনেক খুশি। এই নে তোর রুটি বলে টেবিলে রাখলাম খেয়ে নে?
ধন্যবাদ আমার লক্ষী চাচী।
হয়েছে আর এসব ধন্যবাদ টন্যবাদ লাগবে না খেয়ে পড়ায় মন দে।
ঠিক আছে চাচী।
রহিমের মা চলে গেল। ইমন চেপা সুটকির বর্তা দিয়ে রুটি খাচ্ছে আর কাঁচা মরিচের ঝালে হা হু করছে। তিন গ্লাস পানি পান করে ঝালের কিছুটা নিবারণ করে পড়ায় বসেছে। জানালা দিয়ে সোনালি সকালে সূয এসে উকি দিয়েছে। বসন্তের হালকা বাতাসও প্রবেশ করছে ঘরে। ভোওে দোয়েল তার সুরেলা কন্ঠে অবিরাম গান গাইছে। ইমনের হঠাৎ করে মনে হলো সিমানা তো বলেছিল সকালে আমার জন্য পুকুর পাড়ে অপেক্ষা করবে। যাবে কি না তা ভাবছে ইমন। বুদ্ধি করলো যাবো তবে একটু দেরি করে। দেখি সিমানা আমার জন্য অপেক্ষা করে কি না। সাড়ে সাতটা বেজে গেছে ইমনের কোন খবর নেই। সিমানা বিরক্ত হয়ে গেল। একা একাই বলছে আজ আসবে না আমাকে কাল বললেই তো হতো তোমার সাথে দেখা করতে পারবো না। না কি আমি কতক্ষণ অপেক্ষা করি তা দেখার জন্য দেরি করছে। না আসলেও আমি নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো দেখি আমার সাথে দেখা না করে কিভাবে কলেজে যাই বলে বসে পড়েছে। হঠাৎ পেচন থেকে ডাক শুনতে পেল সিমানা এই সিমানা?
সিমানা শোনেও না শোনার ভান ধরেছে রাগে। ইমন সামনে এসে সিমানার মুখের বরাবর বসে পড়লো। সিমানা ইমনের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত সিমানা। তুই যে আমার জন্য এখানে এই সময় অপেক্ষা করছিস আমার একদমই খেয়াল নেই।
সিমানার কোন উত্তর নেই। অভিমান করে মুখটা অন্ধকার করে রেখেছে। সিমানার মুখ দেখলে যে কেউ বলবে যে তার বুকে হাজার বছরের দুঃখ লালন করছে।
ইমন বলল সিমানা তুই রাগ করলে তোকে অনেক সুন্দরী লাগে। জীবনানন্দ দাশ তোকে দেখলো না আর তুই জীবনানন্দ দাশ কে দেখলি না আমার অনেক আফসোস হয়।
সিমানা এবার অভিমান ভেঙ্গে বলল কেন তোর আফসোস হয়?
কেন আবার আফসোস হবে জীবনানন্দ দাশ যদি তোকে দেখতো তাহলে বনলতা সেন কে নিয়ে না লিখে তোকে নিয়ে লিখতো।
তুই কিন্তু সব সময় আমাকে নিয়ে বাড়িয়ে বলিস ইমন।
কে বলেছে আমি বাড়িয়ে বলি তোকে নিয়ে?
কে আবার বলবে তা তো আমি নিজেই দেখছি।
সত্যি সিমানা তোকে অনেক সুন্দরী লাগে তুই যখন রাগ করিস। আমার আফসোস সত্যিই জীবনানন্দ দাশ কেন তোকে দেখলো না। দেখলো হয়তো বাংলা সাহিত্যে আরোও একটি রোমান্তিক কাব্যগন্থ স্থান পেত।
দেখ ইমন আমি এসেছিলাম তোকে একটি কথা বলবো বলে।
বল তোকে কে না করেছে?
না আজ আর তোকে বলা যাবে না।
কেন বলা যাবো না?
তোর যা অবস্থা আমি আজ দেখছি এই অবস্থায় তোর সাথে কোন কথাই বলা উচিত না।
তাই নাকি?
তাই।
তাও আমার জন্য ভালো। তাহলে তো আমাকে আজ আর কোন কথা বলবি না তুই?
না বলবো না। বেশ আমিও শোনতে এতো আগ্রহী না। নয়টা বেজে গেছে।
তো আমি কি করবো বলল সিমানা।
তোর কিছু করতে হবে না। আমি কলেজে যাবো চলি।
ঠিক আছে যা তবে শুনে রাখ আমি বিকালে তোকে কথাটি কিন্তু বলবো।
ঠিক আছে দেখা হলে বলিস বলে ইমন চলে যাচ্ছে। ইমনের চলে যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে অপলক থাকিয়ে রইল সিমানা আর মনে মনে বলছে আমি আজ তোকে বলেই ফেলবো আমি যে তোকে ভালোবাসি বলে সিমানাও চলে গেল। পুকুর পাড়ের সবকটি শিমুল গাছেই পাখিরা বসন্তের আনন্দে কিচির মিচির শব্দ করছে আর শিমুল ফুলের রস পান করছে। ইমন বাড়িতে গিয়ে তারাতারি রেডি হয়ে কলেজের যাওয়ার জন্য বের হয়েছে। রহিমের মা ইমন কে দেখে বলে কিরে বাবা ভাত খাবি না?
না চাচী এখন সময় নেই তারাতারি কলেজে যেতে হবে আজ কলেজে অনুষ্টান আছে।
কি অনুষ্টান? মুক্তিযুদ্ধের উপর একটি নাটক হবে। ঢাকা থেকে নাটক করার জন্য নাট্যদল এসেছে। ইমনের মুখ থেকে মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনে রহিমের মার চোখে জল এসে গেল।

ঠিক আছে বাবা কলেজে কিছু খেয়ে নিস।
চাচী আমি আসি বলে ইমন সাইকেল নিয়ে চলে গেল। ইমন কুসুমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনেই যেতেই দেখে ইমাও কলেজে যাচ্ছে। ইমন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছে আমি কি ইমাকে কিছু বলবো নাকি? আবার ভাবছে না যদি ইমা কোন কথা না বলে তাহলে তো আমি লজ্জা পাবো। আবার ভাবে কথা না বললে নাই বলুক আমি কথা বলার চেষ্টা তো করতে পারি। ইমন এতো সব চিন্তা করা শেষ করতে না করতেই ইমাই এসে বললে ভালো আছেন?
ইমন ততমত করে সাইকেল থেকে নেমে বলল জ্বি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?
ইমা বলল হ্যা ভালো আছি। আপনি কলেজে যাচ্ছেন?
জ্বি কলেজে যাচ্ছি। আপনি?
আমিও কলেজে যাওয়ার জন্যই বের হয়েছিলাম হঠাৎ দেখি বাবার চশমা বাসায় ফেলে রেখে এসেছিলো তা দিতে পরিষদে এসেছিলাম।
ও আচ্ছা।
ইমা বলল হেঁটে কলেজে গেলে কি আপনার কোন সমস্যা হবে?
কেন?
না আপনার যদি কোন সমস্যা না থাকে তাহলে আমরা হেঁটে কলেজে যাই।
না কোন সমস্যা নেই চলুন।
অনেক্ষণ কোন কথা নেই দু’জনের মধ্যে। গাঁয়ের সরু মেটো পথ ধরে কলেজে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে ইমা ইমনকে বলল আপনাদের গ্রামের নাম কি?
শান্তিপুর।
শান্তিপুর কি আমাদের ইউনিয়নে মধ্যে পড়েছে?
না, শান্তিপুর কুসুমপুর ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। এ কথা বলার পর আবার কথা বন্ধ দু’জন আনমনা হয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ইমন মনে মনে ইমার কথা ভাবছে। ইমাও সেটা খেয়াল করলো ইমন কি যেন একটি ভাবছে। আপনি কিছু ভাবছেন?
না কিছু ভাবছি না বলল ইমন।
ইমা বলল আচ্ছা আমরা একজন অন্য জনকে আপনি বলে সম্মোধন না করে তুমি বলে কি সম্মোধন করতে পারি না ?
হ্যা তা তো করতেই পারি, যেহেতু আমরা একই ক্লাসে পড়ি।
তাহলে আপনি আমাকে আর আপনি বলে সম্মোধন করবেন না বলল ইমা।
ঠিক আছে আপনিও কিন্তু তুমি বলে সম্মোধন করবেন না।
ঠিক আছে আমি আপনাকে তুমি বলেই সম্মোধন করবো।
ইমন তোমার বাবা কি করেন?
ইমন কোন কথা বলল না।
ইমা আবার বলল ইমন তোমার বাবা কি করেন?
বাবা বেঁচে নেই।
আমি খুবই দুঃখিত ইমন তোমার বাবার কথা বলে আমি মনে হয় তোমার মনে দুঃখ দিয়ে দিয়েছি।
না সমস্যা নেই।
তোমার মা তো নিশ্চই আছেন।
হ্যা মা আছেন। মা বেসকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা।
মার কথা বলে ইমন চুপ করে আছে। ইমা ইমনের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ করে ইমা উচু মাটি থেকে নিচু মাটিতে পা ফেলতে পড়ে যাচ্ছিল ইমন সাইকেল ফেলে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির হাতে ধরলো। ধন্যবাদ তুমি আমাকে না ধরলে মনে হয়ং কাদাঁয় পড়ে যেতাম বলল ইমা।
ধন্যবাদ কেন?
তুমি যে আমাকে ধরে বাচাঁলে।
শোন ইমা বন্ধুত্বের মাঝে কোন ধন্যবাদ দেওয়া লাগে না। একতা শুনে ইমা একটি মুছকি হাসি দিল। কথা বলতে বলতে কলেজ গেইটে এসে ইমন বলল ইমা তুমি ক্লাসে যাও আমি কলম আনার জন্য ক্যান্টিনে যাবো।
ঠিক আছে গেলাম।
ইমা ক্যাম্পাসে চলে গেল আর ইমন ক্যান্টিনে এসে দেখে সিয়াম বসে আছে। সিয়াম কে দেখে ইমন মনে মনে ভাবছে এই সালা আজও মনে হয় ইমা কে নিয়ে জ্বালাবে। এখন সিয়ামের কাছে বসা যাবে না। বসলেই প্রসঙ্গ টেনে আনবে। কলম নিয়ে ইমন সিয়ামকে দেখার ভান করে বের হয়ে গেল। পেচন থেকে সিয়াম ইমনকে ডাক দিল এই ইমন দাঁড়া আমিও ক্লাসে চলে যাবো।
ইমন মনে মনে বলে যা ভেবেছিলাম, তাই হলো।
কিরে তোকে মন মরা লাগছে কেন? ইমা আজ কলেজে আসিনি বলে নাকি?
দেখ সিয়াম আমি তোকে গতকাল বলেছি ইমাকে নিয়ে কোন মন্তব্য করবি না। ইমার সাথে আমার অন্য কোন রকম সম্পর্ক নেই। থাকলে তো তোকেই জানাবো।
ঠিক আছে দোস্ত আর কোন দিন তোকে আর ইমা কে নিয়ে কোন রকম কথা বলবনা বলল সিয়াম।
ধন্যবাদ। আশা কির তোর এই কথা মনে থাকবে। চল্ ক্লাসে চলে যায়।
চল।
ক্লাসে চলে গেল দু’জনে। ইমন সামনের বেঞ্চে বসেছে। আর সিয়াম বসেছে দ্বিতীয় বেঞ্চে। ইমা বসেছে মেয়েদের বেঞ্চের সারির তৃতীয় বেঞ্চে। ইমন ক্লাস রুমে প্রবেশ করেই মেয়েদের বেঞ্চের দিকে থাকালো ইমাকে দেখার জন্য। তা সিয়াম ভালো করেই লক্ষ্য করেছে। ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক ক্লাস করতে ক্লাসে প্রবেশ কওে ক্লাস করতেছে। তবে ক্লাসে সিয়ামের মন নেই, সিয়ামের মন ইমন এবং ইমার দিকে। সিয়াম লক্ষ্য করছে ইমা একবার ইমনের দিকে থাকাই আবার ইমন ইমার দিকে থাকাই। তা দেখে সিয়াম মনে মনে বলে সালা আমাকে বলেছে ইমার তার প্রেমের সম্পর্ক নেই কলেজটা শুধু শেষ হোক তার পরে বোঝাবো। কলেজ ছুটির পর সিয়াম ইমনের আগেই কলেজ গেইটে অপেক্ষা করছে ইমনের জন্য। সিয়ামকে গেইটে দেখে ইমন বলল তুই কবে আসলি?
এই তো আসলাম।
আমাকে না নিয়ে এতো তাড়াতাড়ি কার জন্য আসলি?
প্রেমিকার জন্য।
তাই নাকি?
কেন আমার কি তোর মতো প্রেমিকা থাকতে পারেনা।
আমার আবার প্রেমিকা ছিল কবে?
কেন ইমার সাথে তোর কি প্রেমের সম্পর্ক নেই?
নারে দোস্ত তুই যা ভেবেছিস তা ঠিক না। ইমার সাথে আমার শুধু বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছুই না।
তাহলে ক্লাসে বার বার ইমার দিকে থাকিয়েছিলে কেন?
ইমা আমার দিকে বার বার থাকিয়েছিল তাই আমিও বার বার থাকিয়েছিলাম।
সিয়াম ইমনের পিঠে আলতো করে একটি থাপ্পর দিয়ে বলল তার নামই প্রেম রে দোস্ত। আজকে ইমার চোখে তোর চোখ পড়েছে। কাল একসাথে ক্যান্টিনে বসে ক্যাক আর চকলেট খাওয়া হবে, পরের দিন তার চেয়ে বড় কোন কিছু হতে পারে। ইমা যখন ক্লাসে বার বার তোর দিকে থাকিয়েছিল আমি নিশ্চিত ইমা তোর প্রেমে পড়েছে।
ইমন মুচকি হেসে বললো তোকে তো দেখছি লাভ গরু হয়ে গেলি?
লাভ গরু হয় আর যাই হয় না কেন আমি বললাম তো তোদের প্রেম অচিরেই হবে।
ঠিক আছে দোস্ত যাই হবার হবে। আজকের মতো বিদায় নিলাম বলে ইমন চলে গেল।
সিয়াম ইমনের চলে যাওয়ার দিকে থাকিয়ে বলে সালা ডুবে ডুবে জল পান করো আর আমাকে বলো নারে দোস্ত প্রেমের সমপর্ক নেই। সময়ই সব বলে দেবে বলে। ইমন বাড়িতে চলে গেল। খাবার না খেয়েই শুয়ে রয়েছে। রহিমের মা কাছে গিলে বলল কিরে বাবা তোর কি শরীর খারাপ?
না চাচী আমি ঠিক আছি।
তাহলে এইসময় তুই শুয়ে রইলে যে?
চাচী আমি একটু রেস্ট নিয়ে খেলতে চলে যাবো, তুমি কোন চিন্তা করো না।
তাহলে খাবার খাবি না?
না চাচী কলেজে কলেজের ক্যান্টিনে খেয়ে এসেছি।
আমি গেলাম তোর মা ফিরে আসার আগেই তুই বিছানা থেকে উঠে যাবি।
ঠিক আছে চাচী আমি মা ফিরে আসার আগেই উঠে যাবো।
রহিমের মা চলে গেল। ইমন নিরবে শুয়ে রইলো। হঠাৎ করে ইমার কথা মনে হলো ইমনের। লাজুক দুটি চোখে কিভাবে বার বার থাকিয়েছিল। মনে হয় ইমা আমাকে কোন কিছু বলার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু কোন এক অদৃশ্য বলতে পারছে না। তাহলে কি সিয়ামের কথাই ঠিক হল। ইমা কি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে নাকি? তা কি করে হয়? কোথায় ইমা আর কোথায় আমি? না আমি আর ইমার সাথে আগের মতো কথা বলবো না। বললে হয়তো ইমা আমাকে তার ভালোবাসার কথা বলে ফেলতে পারে। ইমন নিজেই নিজেকে এসব প্রশ্ন করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো। রহিমের মা উঠোনের মাঝে বসে সবজি কাটছে আর বলছে কে করি ছেলেটা কে নিয়ে মা সারাদিন থাকে স্কুল আর টিউশনি নিয়ে ছেলেটার কোন খবর রাখে না। কয়েকদিন ধরে কলেজে নিয়মিত যাচ্ছে না। ঠিক মতো খাবারও খায় না। কি যে হয়েছে খোদাই জানে। ফাহিমা খাতুন এসে বলল কি হয়েছে রহিমের মা?
না আপা কিছুই হয়নি।
তাহলে তুই একা একা কার সাথে কথা বলছিলি?
কার সাথে আবার নিজের সাথেই কথা বলছি।
ইমন কি আজ কলেজে গিয়েছিল?
গেছিল আপা।
বাড়িতে আসছে?
বাড়িতে এসে ছেলেটা কোন কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
ঘুমোক ঘুম থেকে জাগলে আমাকে ডাক দিস?
ঠিক আছে আপা জাগলে ডাক দেবনে।
ফাহিমা খাতুন চলে গেল ঘরের ভিতর আর রহিমের মা রান্না করার জন্য সবজি নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। ঘরে ঘরে নিভু নভু করে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলছে। আশপাশ থেকে মাগরিবের আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। রহিমের মা উনুনে আগুন দিয়ে ইমন কে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিল। ইমন ঘুম থেকে জেগে টিউওয়েবলে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে পড়তে বসলো। ফাহিমা খাতুন নামাজ পড়ে এসে দেখে ইমন পড়তেছে, তাই আর ইমনকে কোন কিছু না বলেই চলে গেল। রহিমের মা রান্না শেষ করে ইমনকে খাবার খাওয়ার জন্য ডাক দিতে গেল ইমনের রুমে। গিয়ে দেখে ইমন পড়ছে তাই ভাবল একটু পড়–ক তার পরে খাবার খাওয়ার জন্য ডাক দেব। ফাহিমা খাতুন বলল রহিমের মা ইমনকে বল খাবার খাওয়ার জন্য আসতে।
বলছি আপা তুমি খাবার টেবিলে বস। আমি ইমনকে ডেকে নিয়ে আসছি।
ইমন খাবার খাওয়ার জন্য ঘুমো ঘুমো ভাব নিয়ে আসল। ছেলের এই ঘুমো ঘুমো ভাব দেখে ফাহিমা খাতুন আর কোন কিছু বলল না ইমন কে। ইমন খাবার খেয়ে চলে গেল তার রুমে। পড়ার জন্য বসলেও পড়ায় মন বসছে না। অনেক্ষণ বসে থেকে পড়ায় কোন রকমভাবে মন স্থির করতে না পারায় অবশেষে ঘুমিয়ে পড়লো। প্রতিদিনকার মতো সকলের নাস্তা খেয়ে ফাহিমা খাতুন চলে গেল টিউশনি করার জন্য। ইমন কলেজে চলে গেল। আজ কলেজে সিয়াম আসেনি। ইমন মনে মনে বলে সিয়াম আসেনি ভালোই হয়েছে। থাকলে আমাকে বারোটা বাজিয়ে দেই। ইমন ক্লাসে বই রেখে এসে কলেজের পুকুর পাড়ের নারিকেল গাছটির নিচে একা একা বসে আছে। আর মনে মনে ইমার কথা ভাবছে কি করে ইমার কাছ থেকে নিজেকে দুরে রাখা যায়। ইমা ক্লাসে বই রেখে ইমনকে খুঁজতে লাগল। হঠাৎ কওে খেয়াল হলো ইমন পুকুর পাড়ে একা বসে আছে। ইমনকে একা বসে থাকতে ইমা দেখে মনে মনে বলে ভালোই হয়েছে ইমন আজ একা বসে আছে। ইমনের সাথে কিছু কতা বলতে পারবো।
ইমা পুকুর পাড়ে গিয়ে বলল কেমন আছো ইমন?
হ্যা ভাল। তুমি কেমন আছো?
ভাল। আজ তোমাকে মন মরা লাগছে কেন ইমন? তোমার কি কি কো সমস্যা?
না কোন সমস্যা নেই।
তাহলে তোমার মুখে আজ কোন হাসি আমি দেখছি না কেন?
শরীরটা তেতন ভাল না ইমা তাই আমার মুখে কোন হাসি নেই আজ।
ঔষুধ খেয়েছো তো?
না খাইনি। কলেজে ছুটির পর ডাক্তারের কাছে যাবো।
এ কি বলছো অসুস্থ্যতা নিয়ে ক্লাস না করলে কি এমন ক্ষতি হবে তোমার?
না ইমা তেমন কিছু না আমার।
ইমন তুমি যদি কিছু মনে না করো তাহলে তোমাকে একটি কথা বলি।
কি বলবা বল। কোন সমস্যা নেই।
তুমি এখন ডাক্তারের কাছে চলো। আগে ঔষুধ খেয়ে তার পরে ক্লাস করবে তুমি।
ইমা এখন ক্লাসের সময় হয়ে গেছে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় নেই। টিপিনের সময় ডাক্তারের কাছে যাবো নে বলে ইমন ইমার কাছ থেকে ক্লাসে চলে গেল। ইমা মনে মনে ভাবছে কি ব্যপার ইমন আমাকে রেখে চলে গেল কেন। আমাকে কি ইমনের ভাল লাগে না। না আজ ইমনের মনের মাঝে কোন দুঃখ বিরাজ করছে। ইমনের কথা চিন্তা করতে করতে এক সমসয় ক্লাসের ঘন্টা পড়লো। ইমা ক্লাসে চলে গেল। ক্লাসে বার বার ইমনের দিকে ইমা থাকলেও ইমন ইমার দিকে একবারও থাকাল না। কলেজ ছুটির পর ইমন কখন যে বের হয়ে গেল ইমা টেরই পেল না। ইমা কলেজ ছুটির পর ইমনকে অনেক খুঁজা খুঁজির পরও পেল না। ইমনকে না পেয়ে ইমা দুঃখ পেয়ে চলে গেল বাড়িতে। এদিকে ইমন ইমার সাথে এই লুকোচরি করেছে শুধু ইমার কাছ থেকে দুরে থাকার জন্য। ইমা যতটুকু কষ্ট পেয়েছে আজ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কষ্ট পেয়েছে ইমন। যতই ইমাকে ভুলতে চাই তই ইমনের মনে পড়ে ইমার কথা। ইমার বাড়িতে গিয়ে শুধুই ইমনের কথা মনে পড়ে। দুই-তিন দিনের পরিচয়ে ইমা ইমনকে ভালোবেসে ফেলেছে। সারা রাতভর ইমনের কথা ভেবে কাঁদতে কাঁদতে দু’চোখ কালো করে ফেলেছে। সকালে ইমার বাবা আসলাম তালুকাদার ইমাকে খাবার টেবিলে দেখতে না পেয়ে ইমার রুমে গিয়ে দেখে ইমা ঘুমিয়ে রয়েছে। পরে ইমাকে ঘুম থেকে উঠে খাবার খাওয়ার জন্য ডাক দিল কিরে মা খাবার খাবি না?
তুমি খেয়ে নাও বাবা। আমি ফ্রেশ হয়ে পরে খাব।
তোকে ছাড়া কি আমি কোনদিন সকালের খাবার খেয়েছি?
বাবা খেয়ে নাও আমি এখন খাবো না।
তুই তো কোনদিন এতো দেরিতে ঘুম থেকে উঠিস না তোর কি হয়েছে আমার কাছে বল?
আমার কিছু হয়নি বাবা। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো।
ঠিক আছে তারাতারি উঠে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে কলেজে যা।
ঠিক আছে বাবা আমি ঠিক সময়ে কলেজে যাবো। তুমি কোন চিন্তা করো না। ইমার কথা শুনে আসলাম তালুকদার খাবার খেয়ে চলে গেল ইউনিয়ন পরিষদের উদ্দেশ্যে। ইমার বড় ভাই শিমুল তালুকদার এসে ইমাকে বলল আজ কলেজে যাবি না?
যাবো ভাইয়া। কেন?
আমিও আজ কলেজে যাবো। আজ আমার সাথে চলে যাবি তারাতারি রেডি হয়ে নে?
ঠিক আছে ভাইয়া আমি রেডি হচ্ছি।
ইমা গোসল করে ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়ার জন্য আয়নার সামনে গিয়ে অবাক হয়ে গেছে। চেয়ে দেখে তার দু’চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে সারা রাত ইমনের জন্য কান্নার করার ফলে। দু’চোখের নিচে কালো দাগ দেখে ইমনের কথা মনে পড়ে গেছে আর অঝর ধারায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। শিমুল বলল ইমা তারাতারি চলে আয় আমি রেডি হয়ে গেছি। আসছি ভাইয়া বলে ইমা ওড়না দিয়ে চোখ মুচতে মুচতে শিমুলের মোটর সাইকেলে গিয়ে বসল। সবুজ শ্যামল গ্রামের উচু নিচু সরু রাস্তা দিয়ে শিমুল মোটর সাসইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে শিমুল বলল কিরে ইমা তোর কি ইমনের সাথে কলেজে দেখা হয়?
ইমা চুপ করে আছে। কোন দেয় না।
শিমুল আবার জিজ্ঞেস করল ইমনের সাথে কলেজে দেখা হয় না?
ইমা ইমানের নাম শোনার পরই চুপি চুপি কান্না শুরু করে। কান্না অবস্থায় বলে মাঝে মধ্যে দেকা হয়।
তুই কাঁদিস কেন?
কাঁদছি না তো।
তোর চোখ দিয়ে পানি আসতেছে কেন?
তুমি কিভাবে বুঝলে আমার চোখ দিয়ে পানি আসছে?
গাড়ির লুকিং গ্লাসে চেয়ে দেখ তোর চোখ দিয়ে কিভাবে পানির আসছে।
ইমা তাৎক্ষনিক উত্তর দিল ভাইয়া চোখে কি যেন একটা পড়েছে।
ও আচ্ছা। গাড়ি কি থামানো লাগবে?
ভাইয়া থামাতে হবে না। কলেজের কাছে তো চলেই এসেছি।
শিমুল কলেজ গেইটে গিয়ে গাড়ি থামাতেই দেখে ইমন হেঁটে কলেজে প্রবেশ করছে। ইমমন কে শিমুল দেখে গাড়ি থামিয়ে ডাক দিল ইমন..
ইমন পেচনে ফিরে তাকলো। তাকিয়ে দেখে শিমুল। আরে দোস্ত তুই কলেজে?
কেন আমার কলেজে আসতে বাধা আছে নাকি?
আরে আমি তা বলছি না। অনেক দিন পরে দেখছি কলেজে তাই বললাম। ততক্ষণে শিমুল গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। ইমা শিমুলের পেচনে দাঁড়িয়ে আছে। শিমুল এগিয়ে এসে ইমনকে বুকে টেনে নিল। ইমা ইমনকে দেখে একটু মুচকি হাসি দিল যাতে ইমন হাসে। কিন্তু ইমন কোন হাসি দিল না। শিমুলকে বলল দোস্ত আমি ক্লাসের ভিতরে বই রেখে আসি তার পর ক্যান্টিনে জমিয়ে আড্ডা হবে।
শিমুল বলল ঠিক আছে দোস্ত রেখে আয়।
ইমা তুইও ক্লাসে চলে যা?
ঠিক আছে ভাইয়া আমি ক্লাসে চলে যাচ্ছি বলে ইমা ইমনের পেচনে দিয়ে হাঁটতে লাগল। ইমা শিমুলে কাছ থেকে একটু দুরে গিয়ে ইমনকে ডাক দিয়ে বলল ইমন একটু দাঁড়াও?
ইমন দাঁড়াল
ইমা কাছে গিয়ে বলল কেমন আছো?
ভাল আছি। তুমি কেমন আছো?
ভাল না।
কেন?
তুমি গতকাল আমার কাছে মিথ্যা বললে তাই।
কি মিথ্যা বললাম?
তুমি বলেছিলে কলেজ ছুটি হলে আমার ডাক্তারের কাছে যাবে তুমি যাওনি। ছুটির পর কোথায় চলে গিয়েছিলে?
বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম আমার অসুস্থ্যতা কমে গিয়েছিল তাই।
তাই বলে কি আমাকে বলে যাবে না। আমি তোমাকে খুঁজেছি কিন্তু পাইনি।
আমাকে তুমি কেন খুঁজেছিলে?
তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
আমি আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম তোমাকে যে কথা দিয়েছিলাম। এজন্য আমি তোমার কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
ঠিক আছে আর আন্তরিকভাবে দুঃখিত হতে হবে না। এখন ক্লাসে চল বই রেখে তো তোমার আবার ভাইয়ার সাথে আড্ডা মারতে হবে।
চলে ক্লাসে চল।
ইমন ক্লাসে বই রেখে ক্যান্টিনে চলে যাওয়ার সময় সময় ইমা বলল আমার জন্য চকলেট নিয়ে এসো।
যদি মনে থাকে তাহলে আনবো আর মনে না থাকলে তো আর কিছু করার নেই বলল ইমন। ইমনের এমন কথা শুনে ইমা বলল ঠিক আছে আশা করি মনে থাকবে বলে একটি মিস্টি হাসি দিয়ে চলে গেল। ইমন যে ইমার সাথে এতো সময় কথা বলেছে তা সিয়াম দেখেছে। সিয়াম বলে আজ দেখবো ইমন কিভাবে বলে আমার ইমার সাথে কোন প্রেমের সম্পর্ক নেই। চকলেট আনে কি না দেখে বলে ক্যান্টেেিন যাওয়ার জন্য অগ্রসর হতেই ইমন দেখে বলে কিরে সিয়াম কোথায় ছিলি তুই?
সিয়াম বলে কোথায় আবার থাকবো আমি শাহ জাহান আর মমতাজের প্রেম লীলা দেখছিলাম।
কিভাবে দেখলি শাহ জাহান আর মমতাজের প্রেম লীলা?
আশ্চর্য কিভাবে দেখবো! আমার দু’চোখ দিয়ে দেখলাম।
তুই কি শাহ জাহান আর মমতাজের যুগেও ছিলে নাকি?
সিয়াম একটি হাসি দিয়ে বলল আরে দোস্ত লাইলি মজনুর প্রেম কোন দিন মরে না। তারা যুগে যুগে প্রেমিক প্রেমিকার মাঝে জন্ময়। বর্তমানে তারা তোর আর ইমার মাঝে জন্ম গ্রহণ করেছে।
তোর কথায় কি যে আমি বলব বুঝতে পারছি না!
সিয়াম বলল না বুঝলে এক কাজ কর তুই ইমার কাজ থেকে বুঝে নেও। তার পরে না হয় আমাকে বুঝালি।
শোন সিয়াম ইমার সাথে আমার কোন প্রেমের সম্পর্ক নেই। ইমার সাথে আমার শুধু বন্ধুত্ব। তুই শুধু আমাদেরকে সন্ধেহের চোখে দেখছিস।
প্রথম দিন কলম এনে দিলি। পরের দিন আবার ক্লাসে এক জনের চোখে আর একজন চেয়ে রইলি। আজ আবার অনেক্ষণ কথা বললি তা কিভাবে দেখবো বল?
ঠিক আছে দোস্ত তোর মনে যা চাই তুই বল। আমি তোকে কিছুই বলবো না।
তুই আবার কি বলবি তুই তো ইমার প্রেমে পড়েই গেছিস।
ঠিক আছে আমি ইমার প্রেমে পড়ে গিয়েছি। এখন ক্যান্টিনে যাবি চল ইমার বড় ভাই শিমুল আসছে আজ কলেজে তোকে পরিচয় করিয়ে দেই।
চল যাই ক্যান্টিনে তবে মনে রাখিস ইমার জন্য কিন্ত তোর চকলেট আনতে হবে।
আনবো নে দোস্ত আগে তোকে শিমুলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। তার পর ভাববো ইমার জন্য চকলেট আনবো কি না।
সিয়াম বলল তুই যাই বলিস দোস্ত মেয়েটি কিন্তু দেখতে যেমন আর চলা ফেরা ঠিক সেই রকম। আমি নিশ্চিত ইমা তোর প্রেমে পড়ে গেছে।
ইমন একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলল তাই নাকি?
আমি বলছি ইমা তোর প্রেমে পড়েছে।
আমি কিভাবে বুঝবো ইমা আমার প্রেমে পড়েছে?
এক কাজ কর তুই কাল থেকে একটানা তিন কলেজে আসিস না?
কেন?
ইমা যদি তোর প্রেমে পড়ে তাহলে নিশ্চিত সে তোকে কলেজে এসে খুঁজবে ।
আমি কিভাবে বুঝবো ইমা আমাকে কলেজে খুঁজেছে?
তা তো ঠিক! এক কাজ কর তুই ইমার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দে এবং বলল তোর বাড়ি আর আমার বাড়ি এক সাথে। ইমা যদি তোকে ভালোবাসে তাহলে আমি নিশ্চিত আমার কাছে তোর খবর জানতে চাইবে ইমা।
তা ঠিক বলেছিস। ঠিক আছে তোকে ছুটির পরে ইমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেব।
ধন্যবাদ দোস্ত আমার আইডিয়াটা গ্রহণ করার জন্য।
তোর তো লাভই হলো ইমার সাথে তোর পরিচয় হয়ে গেল।
সিয়াম বলল তোর কি লাভ হবে না?
আমার কি লাভ হবে?
আরে দোস্ত ইমা তোর পেমে পড়েছে কি না তা তো তুই সহজে জানতে পারলি। এটা কি তোর লাভ নয়?
তা ঠিক আছে। আচ্ছা এসব বিষয় এখন বাদ দিয়ে তারাতারি চল শিমুলেল সাথে দেখা করি বলে সিয়াম ইমন ক্যান্টিনে চলে গেল। এদিকে শিমুল ইমনের জন্য অপেক্ষা করছে। ইমন ক্যান্টিনে গিয়ে শিমুলকে বলল সরি দোস্ত একটু দেরি হয়ে গেছে সিয়ামের জন্য।
সিয়াম কে ?
সিয়ামকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলল আরে দোস্ত এ হচ্ছে সিয়াম কলেজের একজন নিয়মিত ছাত্র।
শিমুল বলল ও আচ্ছা। আমি শিমুল তালুকদার।
কেমন আছো?
সিয়াম বলল এইতো আছি এক রকম।
তুমি কেমন আছো?
কোন রকম দিনকাল চলছে।
শিমুল বলল ভালোই লাগছে আজ কলেজে এসে, বসো আজ বড় করে আমরা সবাই আড্ডা দেব। তার পরে একসাথে দুপুরের খাবার খেয়ে বিদায় হবো।
ইমন বলল নারে দোস্ত বেশিক্ষণ আড্ডা দিলে হবে না। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। সামনে পরীক্ষা ক্লাস মিস করলে ক্ষতি হয়ে যাবে।
শিমুল বলল ঠিক আছে দোস্ত ক্লস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তো সবাই একসাথে তো বসতে পারি?
সিয়াম বলল তা তো অবশ্যই বসবো।
ক্লাস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সবাই একসাথে অনেক্ষণ আড্ডা দিয়ে ক্লাসে চলে গেল। সিয়াম ক্লাসে একবার ইমার দিকে থাকাই আর একবার ইমনের দিকে থাকাই। দেখে তারা কি একজনের দিকে আর একজন গত ক্লাসের মতো থাকাই কি না। দেখে ঠিকই গত ক্লাসের মতো ইমা সিয়ামের দিকে বার বার থাকাচ্ছে তবে সিয়াম ইমার দিকে থাকাচ্ছে না। ইমন ইমার দিকে না থাকানোর কারণ হচ্ছে সিয়ামের সাথে শিমুল বসা। তাই সিয়াম ইমার দিকে থাকানো ইচ্ছা থাকা সত্বেও থাকাতে পারছে না। কারণ শিমুল যদি খেয়াল করে ইমন তার বোনের বার বার থাকিয়ে থাকে তাহলে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল ধরে যাবে। তাই ইমন ইমার দিকে থাকাই না। ক্লাস শেষ হয়ে     (চলবে)

 

শেয়ার করুন




 

 

 

 

© 2017-2020 All Rights Reserved Amadersunamganj.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!