মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০১:৩১ পূর্বাহ্ন

মিতুর টেলিফোন : ইয়াকুব বখ্ত বাহলুল

মিতুর টেলিফোন : ইয়াকুব বখ্ত বাহলুল

জ আমার মনটা বেশ ভালো। সকালে একটি অপ্রত্যাসিত ফোন কল আমার মনটা ভালো করে দিয়েছে। সময় ভোর ছয়টা, হঠাৎ মোবাইলে রিং বেজে উঠল তখন বিছানায় শুয়ে ছিলাম।
চোখে ঘুম ঘুম ভাব বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। চোখে ঘুম থাকায় ফোন নম্বর পরিস্কার ভাবে দেখতে পারছিলাম না। হাত দিয়ে চোখ মুছে খেয়াল করে দেখি অপরিচিত নম্বর। রিসিভ করবো কি না ভাবতে ভাবতেই লাইন কেটে গেল। আমি ও ফোন রেখে দিয়ে শুতে যাবো এমন সময় আবার রিং বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে নম্বর খেয়াল না করেই কল রিসিভ করলাম। হ্যালো কে বলছেন, ওপাশ থেকে মহিলা কন্ঠ ভেসে আসলো। হ্যালো কেমন আছো? হ্যালো তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? আমি অপ্রস্তুত উত্তরে কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না, আমি একটু সময় নিয়ে বললাম হে শুনতে পাচ্ছি। আপনি কে বলছেন এবং কাকে চাচ্ছেন? আমি আপনাকে চিনতে পারছিনা। আমি সাহেদ কে ফোন দিয়েছি, আমি যদি ভুল না করে থাকি তাহলে তুমি সাহেদ?
আমি উত্তরে বললাম হে হে, আমি সাহেদ, কিন্তু আপনাকে তো আমি চিনতে পারছি না।
এই সাহেদ তুমি আমাকে আপনি আপনি করছো কেন ? আমাকে চিনতে পারছো না আশ্চর্য এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?
আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না, চুপ হয়ে রইলাম ওপাশ থেকে বললো এই সাহেদ চুপ কেন সত্যি কি তুমি আমাকে চিনতে পারছো না? নাকি চিনে না চিনার বান করছো। ওপাশ থেকে এভাবে কথা গুলো ভেসে আসছিল মনে হচ্ছিল পরিচিত কন্ঠ কিন্তু পরিস্কার মনে করতে পারছিলাম না ।
হ্যালো সাহেদ তুমি আমার কথা শুনতে পারছো? আমি বললাম হে শুনতে পারছি। শোন আমি মিতু বলছি আমেরিকা থেকে এবার নিশ্চয়ই চিনতে পেরেছো? আমি একটু ভেবে মৃদু সুরে বললাম হে চিনতে পেরেছি ।

মিতু আমার বাল্য কালের বন্ধু। একই গ্রামে পাশাপাশি ছিল আমাদের বাড়ি। প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত এক সাথে লেখা পড়া করেছি। সেই সুবাদে আস্তে আস্তে মিতুর সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন দুজনে চুটিয়ে প্রেম করেছি। মিতু আমাকে ছাড়া এক মুহুর্ত থাকতে পারতো না, আমার ও ছিল একি অবস্থা। মিতুর বাবা ছিলেন আমাদের গ্রামের অর্থাৎ রসুলপুর গ্রামের সবচাইতে সম্পদশালী লোক। আর আমার বাবা ছিলেন কৃষক কৃষি জমি চাষ বাস করে বাবা সংসার চালাতেন। রসুলপুর গ্রামের হাইস্কুল থেকে মিতু আর আমি একি সাথে এস এস সি পাস করি। উভয়ের পরিক্ষার রিজাল্ট ভালো ছিল। মিতু কে তার বাবা উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকায় একটি কলেজে ভর্তি করে দেন। আমি অনেক কষ্ট করে আমাদের উপজেলা সদর ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হই। মিতুরা এক ভাই এক বোন মিতুর ভাই মিশু আগে থেকেই ঢাকায় একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতো। সে জন্যে বাসা ভাড়া করে থাকতো ঢাকায়, এখন মিতু ও মিশু একি বাসায় থেকে লেখা পড়া করে। আমাদের গ্রাম থেকে উপজেলা সদর ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। আমি বাড়ি থেকেই কলেজে আসা যাওয়া করতাম। কলেজ ছুটি হলে ঢাকা থেকে মিতু বাড়িতে আসতো। অল্প কয়দিন থেকে আবার ঢাকায় চলে যেতো। বাড়িতে আসলে আমার সাথে দেখা হতো তবে আগের মতো দুজনের দেখা সাক্ষাৎ হতো না। এভাবেই দীর্ঘদিন মিতুর সাথে ছিল যোগাযোগ। আমি ও উপজেলা সদর ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকায় চলে আসি, তবে পড়তে নয় চাকরি খুঁজতে। অনেক চেষ্টার পর একটি প্রাইভেট অফিসে সহকারী হিসেবে চাকরি পাই। চাকরির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার আশায় রাত্রি কালীন একটি ল’কলেজে ভর্তি হই। ঢাকায় আসাতে প্রথম প্রথম মিতুর সাথে প্রায়ই দেখা হতো। এর পরে যখন দিনে চাকরি রাতে কলেজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম মিতুর সাথে যোগাযোগ কমতে থাকলো। এরি মাঝে আমার জীবনের বটবৃক্ষ আমার পিতা পারি জমালেন পরপারে। হয়ে পরলাম অভিভাবক শূন্য। পরিবারে বড় সন্তান হিসেবে আমাকেই ধরতে হলো পরিবারের হাল। নিজের লেখাপড়া এবং পরিবারের খরচ যোগাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। বাড়তি আয়ের জন্য টিউশনি করতে মনস্থির করলাম। অপরিচিত ঢাকা শহরে আমার জন্যে টিউশনি পাওয়া ছিল অনেক কষ্টের। অবশেষে এক অফিস কলীগের সহযোগিতায় টিউশনি পেলাম। সকাল বিকাল টিউশনি, দিনে চাকরি রাতে কলেজ, এমনি দিন রাত পরিশ্রম করে নিজেকে এবং পরিবার কে টিকিয়ে রাখতে মগ্ন হয়ে কাজ করতে থাকলাম। প্রবল ইচ্ছা থাকলেও মিতুর সাথে দেখা করতে পারতাম না। এভাবে আস্তে আস্তে মিতুর সাথে আমার দূরত্ব তৈরি হতে থাকলো। আমি যখন ল’ ফাইনাল ইয়ারে মিতু ও মাষ্টার্স পড়ছে, এরি মধ্যে মিতুর বাবা মিতুকে বিয়ে দিতে পাত্র ঠিক করে ফেলেছেন। এই খবর একদিন মিতু নিজেই আমাকে দেখা করে বলে ছিল। কিন্তু বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে সেদিন আমি আমার ভালবাসার জন্যে কিছুই করতে পারিনি। পরে শুনেছিলাম আমেরিকা প্রবাসী এক উচ্চশিক্ষিত ছেলেকে বিয়ে করে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছে মিতু। স্বামী নিয়ে আমেরিকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এরি মাঝে আমিও ল’ পাশ করে উকালতি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করলাম। দীর্ঘ এক যোগ পর হঠাৎ মিতুর ফোন পেলাম। অনেক কথা হলো প্রাইমারি থেকে স্কুল জীবনের অনেক স্মৃতি এঁকে অন্যের সাথে শেয়ার করলাম। মিতু তার একমাত্র ছেলে সন্তান বাবু এবং স্বামীকে নিয়ে ভালো আছে জেনে খুশি হলাম । দীর্ঘ বিরতির পর ভালোলাগার মানুষের ফোন আলাপ সত্যি ভীষণ মধুর। মিতুও এখন স্বামী সংসার নিয়ে ব্যস্ত জীবনে সুখী। আমি ও স্ত্রী একমাত্র মেয়ে মিথিলাকে নিয়ে সুখেই আছি।

লেখক: ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি: এইচ এমপি উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।

শেয়ার করুন




 

 

 

 

© 2017-2020 All Rights Reserved Amadersunamganj.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!