মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন

চিঠি : আনোয়ারা খাতুন

মি নাকি গ্রামের বৌ ঝিদের গোপন পত্র লেখক। কথাটা আজ কাল পুকুর ঘাটেই সীমাবদ্ধ নেই, মোড়ের দোকানে কথাটির লম্বা পাখা গজিয়েছে। এতো কান কথা, এতো টিটকারি আমাকে দমাতে পারেনি। যত বারই প্রাচীরের পাশে নীরু কাকির ছলছল নয়নগুলো দেখেছি ততবারই প্রতিজ্ঞা করেছি, যাই হবার যাক, আমি নীরু কাকির মনের কথা যতিন কাকুর কাছে পৌঁছাবোই। কিন্তু শুধু মনের কথা লিখলেই তো হবে না সেটা ডাকঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। ডাকঘরটি বাড়ি থেকে পাঁচ কিলো দূরে। যে গৃহবধুর ঘর থেকে পুকুর ঘাটে যেতে বারণ, তার পক্ষে এতো দূরে চিঠি পোষ্ট করা দুরের কথা ভাবাটাই পাপ। আমি সবে মাত্র প্রাইমারির গন্ডি পার হয়ে শহরে নামি দামি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। সেই দিন নীরু কাকীকে প্রথম প্রাণ খুলে হাসতে দেখলাম। কারণ জানতে চাইলে তিনি হেসে বললেন, জানো আমি যদি চারটি ডিগ্রী অর্জন করতাম তবুও এতো খুশি হতাম না, যতটা খুশি হয়েছি তুমি এই স্কুলে ভর্তি হলে বলে। কারণটা আমি বুঝেছিলাম আমার স্কুল থেকে মাত্র দেড় কিলো হেঁঠে রেল লাইন পার হলেই ডাকঘর। চিঠি পোষ্ট করতে যেয়ে বেশ কয়বার ধরা পড়েছি। স্যাররা আমাকে স্কুলের মাঠে রোদের মাঝে কান ধরে নীল ডাউন করে রেখেছে বহুবার। এই বয়সে স্কুল ফাঁকি দেওয়া? হেড মাস্টার এই খবরটি বাবাকে দিতে দেরি করেননি। আমার উপর চলে গরম পিটুনি। স্কুল ফাঁকি দেয়ার আসল কারণট সেদিন আমি বাবাকে বলতে পারিনি, বললে নীরু কাকীকে ঘর ছাড়তে হবে। কাজেই আমার স্কুল পালানোর ঘটনাটি যে ভাবে পারে লোকে ডাল পালা তৈরি করেছিলো। নীরু কাকী আমার এমন একজন বন্ধু যার জন্য হাজারটা মিথ্যে বলা দোষের কিছু মনে করিনি। সেদিন আমায় যদি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বলা হতো আসল সত্যিটা কি? আমি তখনো নীরু কাকীর পক্ষেই কথা বলতাম। সবার জীবনেই এমন কিছু মানুষ থাকে যার সুখের তরে মানুষ মরতে দুইবার ভাবে না, নীরু কাকি আমার তেমনি একজন। যাক, নীরু কাকির কথা বলি একটি হলুদ খামের মূল্য দুই টাকা। এই দুটি মাত্র টাকা নীরু কাকির হাতে কখনো থাকতো না। আগে তার বাবার বাড়ি থেকে কেউ আসলে কাকির হাত খরচটা দিয়ে যেতো, বছর খানি হলো তাদেরকে এই বাড়িতে আসতে নিষেধ করেছে যতিনের মা। নীরু কাকীওও চিঠিতে উল্লেখ করলো, বাবা অপমানের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। এই বাড়িতে এসে অপমান হওয়ার চেয়ে নীরু মরে গেছে এইটা মেনে নেয়া ঢের উত্তম, তোমরা তাই করো বাবা এতে সবার মঙ্গল হবে। যতিনের মায়ের যৌতুকের চাহিদা দিন দিন বাড়তেই থাকে, যা পরিশোধ করা নীরুর বাবার সম্ভব ছিলো না।
থাক এইসব কথা, আমি ছিলাম নিরুপায়। সংসারের মার পেচ না বুঝলেও এইটুকু বুঝেছিলাম, যে সংসারে স্বামী তার স্ত্রীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় না, সে সংসারে চামচিকাও এই অবলা স্ত্রীলোকটিকে লাথি উস্ট্রা দিতে বিলম্ব করে না। এবং যে স্ত্রীলোক বাল্যকাল থেকে ধিক্ষা পাওয়া মহিলাদের চিকন রাজনীতিতে পটু তারা একদিন নিজগুণে সংসারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি দখল করে নেয়। জগতে সবার প্রিয় পাত্রী তারাই হয়, যারা জায়গা দাঁড়িয়ে মৃতকে জীবন্ত আর জীবন্তকে মৃত বলে প্রমাণ করতে পারে। যার কোন গুণই নীরুর ছিলো না। মুখের উপর সত্য বলার অপরাধে নীরুকে আগুনের চেকা পর্যন্ত খেতে হয়েছে। আজ-কাল নীরু বড্ড শক্ত হয়ে গেছে, মুখে কোন রায় নেই, বোবা প্রাণীর ন্যায় চলছেতো চলছেই। কিস্তু সে ভুলে গেছে, মুখ বুঝে অন্যায়কে যত সইবে, অন্যায়কারিরা ততই মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। অন্যায় সয়ে হাজার বছর বাঁচার চেয়ে প্রতিবাদ করে মরে যাওয়া বহু সম্মানের।
মনে মনে ঠিক করলাম, নিরু কাকিকে যদি এতটুকু শান্তি দিতে পারি তাহলে আমার জীবন সার্থক হবে। কাজেই আমি চিঠির খাম কিনার জন্য টিফিন না খেয়ে টাকা জমাতে থাকি, রিক্সা না চড়ে পায়ে হেটে স্কুলে আসা যাওয়ার ১০ কিলো অতিক্রম করি। তাতে যখন ব্যর্থ হয়েছি, মায়ের হাঁস মুরগির খোয়ার থেকে দিনের পর দিন ডিম, বাগান থেকে লেবু চুরি করে স্কুলে যাওয়ার পথে বিভিন্ন দোকানে এগুলো বিক্রি করেছি। সে টাকা দিয়ে কখনো নীরু কাকির জন্য হলুদ খামে চিঠি পোষ্ট করতাম, কখনো এক কৌটা সিঁদুর, কখনো হাস মার্কা নারিকেল তেল ক্রয় করতাম। সে জন্য নীরু কাকিকে নানা অপবাদ সইতে হয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য নীরুর মৌলিক চাহিদা পূরণ না করলেও অপবাদ দিতে তার ননদ শ^াশুড়ির ভুল হতো না।
যতিন কাকুকে এতোগুলো চিঠি পাঠালাম কিন্তু একটি চিঠিরও উত্তর পেলাম না। আরো বড় আশ্চর্য্য হলো, প্রতি মাসেই যতিনের মানি অর্ডার এবং চিঠি আসতো তার মায়ের কাছে, তাতে ভুল করেও নীরুর নামটি উল্লেখ করতো না। প্রজাপতির মন্ত্র পড়ে সাতপাক ঘুরে জনসম্মুখে অগ্নি সাক্ষী রেখে একমাথা সিঁদুরে রাঙিয়ে বছর তিনেক আগে এই বাড়িতে একটা অবলা প্রাণি এনে তুলেছিলো। যতিন সে কথা আজ কাল ভুলেই গেছে। যতিনের মা এতোটাই আহ্লাদ মাখা পত্রের উত্তর দিতো যে দুনিয়ার অন্য কিছু মনে রাখার প্রয়োজন হতো না। মায়ের কান্নাকাটির এতোটাই জোড় ছিলো যে লক্ষী মন্ত্র বৌটি প্রথম দিন থেকেই চক্ষুশুল হয়ে গেছে। নিজে থেকে এই আপদটা কবে বিদায় হবে এই অপেক্ষা সবাই আছে। আমি বলি কি মাকে নিয়ে যদি এতো বাড়াবাড়ি তবে বিয়ে করার কি দরকার ছিলো?
আমি বড় ক্লাসে উঠে গেলাম আগের মতো যখন তখন বাইরে যাওয়া হয়ে উঠে না। খাম কিনার জন্য লাইনে দাড়াঁতে সংকোচ লাগে। দুয়েকজন জিজ্ঞেস করে মনের মানুষকে লিখেছো বুঝি? আমি লজ্জা মরি মরি। তাছাড়া এক তরফা চিঠি লিখতে কার ভালো লাগে? আজকাল নীরু কাকিকে দেখলে বুকের ভিতরটা হাহাকার করে উঠে। শ^াশুড়ির ছেঁড়া ময়লা শাড়ি পড়ে কোন রকমে দিন পার করছে। হায়রে কপাল বিয়ের পর থেকে আজো না হলো বাবার বাড়ি যাওয়া, না হলো স্বামীর মুখখানি দেখা। নীরু কাকির চেহারাটা আজ কাল একুশ না একান্ন বুঝাতে বড় কষ্ট হয়। বেঁচে থাকলে মানুষের বদল হয় এটাই স্বাভাবিক। অত্যাচার মানুষকে বিদ্রোহী করে তুলে। চিরকাল মুখ বুঝে সইতে সইতে এখন বিড়ম্বনা যতই হউক মুখের উপর উত্তর দিতে নীরু আর ভয় পায় না।
আজো আমার স্পষ্ট মনে আছে, সে দিন বিকাল থেকেই আকাশে মেঘের প্রচ- গর্জন। রাতের খাবার খেয়ে সবাই ঘুমাতে গেছে। সেই রাতে নীরু সবচেয়ে বড় দুঃসাহসিক কাজটি করে বসলো। আঁধারের বুক ছিঁড়ে ভীরু ভীরু পায়ে আমাদের ঘরে এসে হাজির হলো। আমাকে জড়িয়ে ধরে রোদন করে বললো, আমার জন্য তুমি যা করেছো, তা আমি সাত জন্মেও শোধ করতে পারবো না গো। আমায় তুমি ক্ষমা করো। তার গলা ধরে আমিও খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। আমার বাবা চিরকাল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে, তিনি পরার্মশ দিলেন, নীরু যেনো বধুঁ নির্যাতনের জন্য যতিনের পরিবারের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয়। নীরু চুপ করে শুনেছে, মৃদু হেসে বললো, দুনিয়ার আদালত তো স্বার্থের পক্ষে রায় দেয়। উপরে একটি মস্ত আদালত আছে, সেখানকার হাকিম মহোদয় চুল পরিমাণও অবিচার করেন না। শূন্য হাতে অভিযোগ দেওয়ার একমাত্র আদালত সেটি। আমি না হয় সেই বিচারের অপেক্ষা রইলাম।
নীরুর শরিরের ক্ষতগুলো দেখে আমরা অঝর ধারা কেঁদেছি। কয়দিনের উপুস নীরু আমাদের ঘরে এসেছিলো কেন জানি না। কিন্তু নিজের গৃহে যে আর থাকতে পারছিলো না এইটুকু স্পষ্ট বুঝেছি। নীরু বলেছিলো আর দেখা হবে কিনা জানি না। আমার ননদ আর শ^াশুরি আমাকে বিদায় করার জন্য সব রকম আয়োজন করছে। এই বিদায় কথাটির অর্থ আমি বুঝতে পারিনি, পারলে হয়ত অন্য পথে হাঁটতাম। যাক, সেদিন সে দুটি চিঠি লিখেছে তার অংশ বিশেষ তুলে ধরছি। প্রথমটি তাঁর বাবার কাছে,
বাবা শৈশব থেকে যে শিক্ষা তুমি আমায় দিয়ে এসেছো সেটা সঠিক ছিলো না। কন্যা জন্ম দিয়ে যতটা পাপ করেছো তার চেয়ে বেশি পাপ করেছো সংসারের চিকন রাজনীতি শিক্ষা না দিয়ে। বাবা তুমি বড্ড মিথ্যাবাদী, জনমভর বলে এসেছো আমি নাকি দেখতে সাক্ষাত মা লক্ষী কিন্তু এই বাড়িতে আসার পর থেকে শুধু অপয়া আর অলক্ষী নামটিই শুনে আসছি। বাবা জগতে যার কপার সুন্দর সেই আসল ভাগ্যবতি। ভগবান মেয়েদের কপাল লিখেন বাবার সম্পত্তি দেখে। যে বাবার সম্পত্তি যত বেশি সে বাবার মেয়েদের কপাল ততই সুন্দর। দরিদ্র বাবার কন্যারা যতই রুপবতি হউক তাদের মান্দার ফুলের সাথে তুল্য করা হয়, দেব সেবা কাজে লাগায় না। বাবা পাত্র পেলেই মেয়ের বিয়ে দিতে হয় না। তার চরিত্র, পরিবারের আচরণ, বংশ মর্যাদা সব কিছু যোগ বিয়োগ করে তবেই পা বাড়াতে হয়। লোকের কথা কান না দিয়ে আমার বোনদের বাংলা ইংরেজীর পাশাপাশি সংসারের রাজনীতিটুকু শিক্ষা দিও। তোমার আত্মার ধন যদি সুখে থাকে লোকের কথা কিবা আসে যায়? আমাকে তোমরা ক্ষমা করো।
দ্বিতীয় চিঠিটি স্বামী যতিনকে,
কি ভাবো নিজেকে? মাস শেষে কয়টাকা মাইনে পাও বলে আমাকে এতো অবহেলা? বাবা যখন আমাকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছিলো তখনতো এমনটি কথা ছিলো না। স্ত্রীকে বরণ পোষণ কথাটির মানে জানো? জানা উচিত ছিলো। সংসার কাকে বলে আজো আমি বুঝে উঠতে পারছি না। একা একা কে কবে সংসার করেছে আমার জানা নাই। মেয়ে সুখে থাকার আশায় চাকুরিজীবি বর দেখে বাবা মা মেয়ের বিয়ে দেয়। আমাকেও তুমি বেশ রেখেছো, সিঁিথটা সাদা হয়ে থাকলেও দেখার মানুষ নাই। যেমনটি আমার বয়সি কেউ থাকে না। সেই শুভ দৃষ্টিতে তোমাকে দেখেছিলাম চেহারাটা এখন আর ভালো করে মনে পড়ে না। তোমাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করে। জানো আজ কাল চাঁদ দেখি না, একা একা তারা গুণে কতোকাল পার করবো বলোতো? যাদের স্বামী বিদেশে থাকে তারাও স্ত্রীকে হাজারটা শান্তনা দিয়ে পত্র লিখে। আমার জন্য তোমার কাছে একটুকরা কাগজও কি বরাদ্ধ নাই? কোন ধাতু দিয়ে তৈরী গো তুমি? এই অনাত্মীয় পরিবেশে কেমন আছি নাইবা জানলে, তোমার কথাতো জানাতে পারো। নিজেকে কোন মুখে পুরুষ বলে দাবি করো? জানো বৌদি বলেছে, যাকে স্বামী সোহাগ করে সে কখনো নাইওর যেতে চায় না। আমার নাইওর যাওয়ার ছুটিটুকু এই জীবনে হবে কি না জানি না। মায়ের কথা মনে পড়ে, মা বলেছে আমি হেরে গেলে ওরা জিতে যাবে। যাদের মন্ত্রে তুমি সদায় চলো। পৃথিবীতে ওরাই তোমার সব আমি কিছু না। অহেতুক জঞ্জাল ঘরে এনে জ্বালা কেনো বাড়ালে? আমার সিঁধুরের দিব্যি রইলো এই কথাটুকু রেখো। বিবাহিতের কোন দাগ আমার গায়ে নাই। আমি মরার পরে আমার হাতটা একবার স্পর্শ করে আমার কুমারি শরীরে কলঙ্কের কালি লেপে দিও। যে দাগ দেখে স্বর্গের দ্বারে গিয়ে আমি তোমায় চিনতে পারি। -ইতি, নীরুপমা
রাত পোহালে দেখি নীরুদের উঠান ভর্তি পুলিশ। যতিনের মা বোন নীরু বিরহে কান্নায় দাপাদাপি করে অস্থির। বিলাপের সুরে ভেসে আসছে, ওরে মুখপুরি কি দুঃখে গলা ফাঁস দিলে? এমন সুখের ঘরে যদি ঠিকতে না পারলে তবে কোন ঘরে তোর জায়গা হতো বল না। কোনো জিনিসের অভাব ছিলো এমন কথা কেউ বলতে পারবে? আরো কতো কি? পুলিশের জেরার মুখে বাড়ির লোকজন বলেছিলো রাত দ্বিপ্রহরে কিছু একটা নিয়ে যতিনদের ঘরে খুব গন্ডগোল হচ্ছিল। প্রতি দিনই এমন চেঁচামেচি হয়ে থাকে তাই আজ আর কেউ কানে নেইনি। চোখের সামনে নীরুর নিথর দেহটা চাটিতে পেঁচিয়ে থানায় নিয়ে গেলো। আমি নির্বাক চেয়ে রইলাম। দুইদিন পর ময়না তদন্ত রির্পোট আসলো নীরুকে কেউ শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রেখেছে। এটা আত্মহত্যা না। সে রাতে লিখা নীরু কাকির চিঠি দুটি পোষ্ট করেছিলাম। এটাই ছিলো আমার শেষ চিঠি লেখা। এই জীবনে আর কারো চিঠি লিখতে মন সায় দিলো না। আজ আমার অনেক টাকা আছে, খাম কিনার জন্য লেবু বিক্রি বা ডিম চুরি কোনটাই করতে হবে না। কিন্তু নীরুর সাথে সাথে চিঠি লিখার প্রচলনটাও উঠে গেছে, শুধু রয়ে গেছে হাজারো নীরুর না বলা কথাগুলো।

লেখক: কবি ও গল্পকার।

শেয়ার করুন




 

 

 

 

© 2017-2020 All Rights Reserved Amadersunamganj.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!