বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:২৮ অপরাহ্ন

ছোট গল্প : নিয়তি : মাহবুবা সিদ্দিকা

ছোট গল্প : নিয়তি : মাহবুবা সিদ্দিকা

বেলা শেষ হয়ে গোধুলি লগ্ন হতেই রোবটের মতো ছুটতে থাকেন কর্মজীবিরা।আমিও এর ব্যতিক্রম নই। আমি মাইশা। মেনেজার পদে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরী করি।নিত্যদিনের মতো আজ ও আমি বাসায় ফিরছিলাম। অফিস থেকে বাসায় লোকাল সি এন জি দিয়ে যেতে হয়।বাড়ি ফেরার তাড়নায় দ্রুত ছুটে আসছি স্টেশনের দিকে। আসতেই দেখি দুই তিনজন ড্রাইভার অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে থাকিয়ে হাসছে।ফিসফিস করে একে অপরকে কি যেনো বলছে আর দাত বের করে ফিকফিক করছে। তাদের প্রত্যকেরই বয়স পয়ত্রিশ  উর্ধ্ব হবে। বিকেলের এই সময়ে স্টেশনে মানুষ জন কমই থাকে।আজকে অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই কম।

আমি কিছু বুঝে উঠতে না পেরে কোনোরকমে নিজেকে সামলে একটা গাড়িতে ওঠে বসলাম।ওদের তাকানোর ভঙ্গিতে একটু বোঝা গেলো ওরা আমার পিছনের দিকে কিছু ইঙ্গিত করছে।গাড়িতে বসে নিজের পিছনের দিকটা টেনে দেখলাম, দুপুরে অফিসের কেন্টিনে লাঞ্চ করতে গিয়েছিলাম। টেবিলে সস পড়েছিলো সম্ভবত। সেটার কিছু অংশ আমার সবুজ কালারের কটির উপর পড়ে পিরিয়ডের দাগের মতো দেখাচ্ছে।তাদের হাসির কারন তাহলে এটাই। মুহুর্তের মধ্যে মাথায় চক্কর শুরু হয়ে গেছে।  শরীর দিয়ে ঝরঝর করে ঘাম বের হচ্ছে।

এটা পিড়িয়ডের চিন্হ নয় তারপর ও কেনো আমি অস্বস্তি অনুভব করছি।পুরো দুনিয়া অন্ধকার লাগছে আমার সামনে। যে আমি কিনা সেফটির জন্য ব্যগে পেপার স্প্রে রাখি,মানুষদের কে কাঁচি, পিন ইত্যাদি সাথে রাখার পরামর্শ দেই। যে আমি কিনা নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী মনে করি সেই আমি আজ অর্ধ বুড়ো কয়েকজনের ইভটিজিং সইতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি।

নাহ,আমাকে এর প্রতিবাদ করতেই হবে। আমি ভীরু নই।আমি সাহসী। বুকে ফূ দিয়ে ভিতরে সাহস সঞ্চার করলাম।পরক্ষণেই গাড়ির দুই সাইটের পর্দা টান দিয়ে কটি খুলে ফেলি। ব্যগ থেকে পেপার স্প্রে বের করে একটানে গাড়ি থেকে নেমে স্প্রে করে দেই অর্ধ বয়সী কুলাঙ্গারদের চোখে।তাদের চিৎকারে মুহূর্তেই জড়ো হয়ে যায় বাজারের অনেক মানুষ। বিষয় কি জানতে চাইলে আমি বললাম, তারা বলেছে রেট কতো? যাবে নাকি? এবং আরো অনেক ধরনের খারাপ ইঙ্গিত করছে। এটা শুনে ড্রাইবাররা থ হয়ে দাড়িয়ে আছে, কারন তাদের কিচ্ছু বলার নেই। যদি পিছনের দাগের কথা তারা বলে, তাহলেও গণধোলাই খেতে হবে।আর আমি কটিটা খোলায় হয়তো এতোটা সাহস নিয়ে কথা বলতে পারছি। পরনে থাকলে হয়তো আস্থিরতা কাটিয়ে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব হতোনা।

আমি যে গাড়িটায় ওঠেছিলাম সেখানে এককজন বয়স্ক ব্যক্তি ও একজন মহিলা সাথে ছোট একটা বাচ্চাকে নিয়ে উঠেছিলেন।তারা পরিস্থিতি ঠিক বুঝে সামলে ওঠতে পারছেননা।

এরমধ্যে স্টেশনে সামান্য হৈচৈ শুরু হয়ে গিয়েছে।  অনেকে অনেক ধরনের কথা বলছে।তখন একজন মুরব্বি বললেন, যারা ইভটিজিং করেছে তাদের কে পুলিশের হাতে দেওয়া হোক আর লাইসেন্স বাতিল করা হোক।সাথে আরেকজন ড্রাইভার কে বললেন, আমি বা যারা গাড়িতে উঠেছে, তাদেরকে নিদিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

বাসায় পৌঁছে কারো সাথে কোনো কথা না বলে ফ্রেশ হয়ে সোজা ছাদে চলে গেলাম।ঘটনাটাকে কোনোভাবেই মন থেকে হেলাতে পারছিনা।কেনো আমার সাথে এমন হলো।মনে অনেক ধরনের ভাবনা এসে জড়ো হয়েছে।

-আচ্ছা, কাল থেকে এই রাস্তায় বাসায় আসতে কি আমার অস্বস্তি লাগবে?
-যাক বাবা বাচলাম, আমার মুখে নেকাব ছিলো কেউ চিনবেনা।
-সবুজ কটিটা ও আর কোনোদিন পড়বোনা।
এগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়লো ক্লাস নাইনের প্রেক্টিকাল পরীক্ষার দিন আমাদের ক্লাসমেট মাহদিয়ার হঠাৎ পিরিয়ড হয়েছিলো। হল থেকে কাঁদো কাঁদো হয়ে কমন রুমে এসে সে বলেছিলো, ক্লাস থেকে বের হওয়ার সময় তার সাদা কামিজে রক্তের দাগ দেখে ক্লাস টেনের ভাইয়েরা অনেক হাসাহাসি করেছে, সাথে আমার ভাই ও ছিলেন।

ঐদিন সবাই আমাকে বলেছিলো বাসায় এসে মাকে যেনো ভাইয়ের কথা নালিশ করি।বড় ভাই তিনি, এই ভয়ে মাকে নালিশ না করলে ভাইয়াকে শুধু এটা বলেছিলাম, তুমি এটা ঠিক করো নাই।প্রতিত্তরে সে বলেছিলো, বেশি কথা বলিস না চুপ থাক।

আজ ভাইয়া বারবার আমায় জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে তোর? যদি তাকে আজকের ঘটনাটা বলি সে কি ঔ দিনের মতো উত্তর দিবে?  নাকি হয়তো বলবে, কারা করেছে এসব, শুধু বল।এক ঘন্টার ভিতরে ওদের লাশ তোর সামনে হবে।

শেয়ার করুন




 

 

 

 

© 2017-2020 All Rights Reserved Amadersunamganj.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!