শুক্রবার, ১০ Jul ২০২০, ০২:৪৫ অপরাহ্ন

আনোয়ারা খাতুন’র গল্প ‘রাজাকার পাতামী’

আনোয়ারা খাতুন’র গল্প ‘রাজাকার পাতামী’

আদম আলী তার মাকে জিজ্ঞেস করলো; পাতামীকে দেখলেই তুমি রেগে যাও কেনো মা? পাতামী তোমাকে কী করেছে? ছেলের এমন প্রশ্নে নিজেকে সামলে নিলো। ছেলে আবার জিজ্ঞেস করলো মা, সেই ছোট থেকে যতবার এই প্রশ্নটা করেছি ততবার তুমি এড়িয়ে গেছো। পাতামী চাচিকে দেখলে তুমি কেমন ক্ষেপে যাও। কেনো মা আজ তোমাকে বলতেই হবে? আম্বিয়া বেগম আজ আর নিজেকে সামলাতে চাইলেন না। সিংহীর মতো হুংকার ছুড়ে বললেন, হ্যা আদম আমি আজ তোকে সব বলবো। তোর জানা দরকার। কার কারণে তোরা পিতা হারা হলি। কে আমার জীবন যৌবন পুড়িয়ে ছাড়কার করে দিলো। ডিসেম্বর মাস এলেই চারপাশে বিজয়ের সুর বাজে। মুক্ত আকাশে উড়ে বিজয়ের নিশান। তপোধ্বনি আর কুচকাওয়াজে মুখরিত হয় চারদিক। আমি স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। দেশ স্বাধীন হলো, সবাই আনন্দে ভাসছে, আমি একা কেনো, আমার মনের আকাশে এতো মেঘ কেনো? ৭১ সাল। দেশে বড্ড গন্ডগোল। মিলিটারির ভয়ে শহরে গ্রামে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ডাকে বাংলার মুক্তিকামী জনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। নারী পুরুষ কেউ রেহাই পাচ্ছে না পাকসেনাদের হাত থেকে। এই গ্রামের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রতাপশালী ব্যক্তি তোর বাপ-চাচা। তোর বাবা জাফর আলী খান। তোর চাচা ইমতিয়াজ আলী খানকে নিয়ে গোপনে ঠিক করলো তারা মুক্তিযুদ্ধে যাবে। দেশের এমন অবস্থায় তাঘড়া দুই যৌবক কিছুতেই ঘরে থাকবে না। ঠিক করলো তারা মুক্তিযুদ্ধে চলে যাবে। আমরা দুই জ্যা জানতে পেরে হাতে পায়ে ধরে অনুরূধ করলাম না যাওয়ার জন্য। কিন্তু এক সময়ের কোস্তীগীর দুই ভাই বলল, যতক্ষন গায়ে একফুঁটা বল আছে ততক্ষন বাংলাকে মুক্ত করার জন্য লড়ে যাবো।

আমরা শর্ত দিয়েছিলাম দুই জ্যায়ের গর্ভের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার পর তোমরা তাদের দেখেই যুদ্ধে যাও। শর্ত মেনেছিলো, আমরা দুই জ্যা আট মাসের গর্ভবতী, তোর বাপ চাচা দিন গুনতে থাকে। চারদিক থেকে খবর আনতে থাকে কোন সেক্টরে কারা কারা পরিচিত আছে। ফাগুন মাসের সকাল বেলা, ধানের চারা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে তোর বাবা বললেন ইমতিয়াজ জালা ক্ষেতে লাগানো হবে, ধান ও ফলবে কিন্ত আমরা বোধ হয় এই ধানের ভাত আর খেতে পারবো না, ইমতিয়াজ বিস্মিত হয়ে বলে কেনো ভাই ! তিনি বললেন যুদ্ধে যদি শহীদ হয়ে যাই। আমি খুব বকেছিলাম তাদের, বলেছিলাম এমন অলক্ষণে কথা বলতে নেই। জাফর আমার মুখপানে ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলে, বউ তিন তিনটা সন্তান তোর হাতে রেখে যাচ্ছি ওদের তুই দেখে রাখিস। আমি যদি ফিরে না ও আসি দুঃখ করিস না। মুক্ত আকাশে যখন পতাকা উড়বে ওদের বলবে আমি পতাকাতে মিশে আছি। আমার একটা জীবন দিয়ে যদি তোদের সবাইকে একটা স্বাধীন দেশ দিতে পারি তাতেই আমি ধন্য। আমি চোখ মুছে রান্না ঘরে চলে যাই। কিছুক্ষন পর লোকজনের চে”াঁমেছি শুনে বের হয়ে দেখি দুই ভাইয়ের সাথে পাতামীর তুলুম ঝগড়া লেগেছে। আমাদের আট-দশটা হাঁস তাদের ক্ষেত নষ্ট করেছে। উভয়পক্ষে তর্কাতর্কি চলছে, একসময় পাতামী তার লম্বা দাতঁ বের করে তোর বাবাকে শাসিয়ে গেলো- এর মূল্য তোকে দিতে হবে জাফর। তোর জীবনে আগুন জ্বালাবো আমি। বিকেল থেকেই পাতামী উধাও। বাড়ীতে নেই, ছোট ছোট বাচ্চাদের রেখে কোথায় যে গেলো কেউ জানে না। আমার খুব ভয় হলো, পাতামী ভালো মানুষ না। সে এই বাড়ির ব্যতিক্রমি বউ। স্বামী শ্বাশুড়ী কারো কথা সে শুনে না। এ নিয়ে বহুত ঝগড়া হয়েছে পূর্বে। এখন সবাই তার বেহায়াপনা মানতে বাধ্য হয়েছে। তোর বাবাকে বললাম, গ্রামের সবাই জানে তুমি যুদ্ধে চলে যাবে। এই মুহূর্তে পাতামীর সাথে ঝগড়া বাঁধালে কেনো? কত বাঁজে লোকের সাথে তার চলাচল এখন যদি কোন গন্ডগোল করে? তোর বাপ, চাচা হেসে উড়িয়ে দিলো, মেয়ে মানুষ সে আমাদের কি করবে? ৭১ এর কোন এক নিশুতী রাতে জাফর ইমতিয়াজের ঘরে কড়া নাড়লো একদল মুখোশপড়া লোক। গ্রামের মানুষ সন্ধ্যা হতে খেয়ে না খেয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে চুপ করে থাকে পাকবাহিনীর ভয়ে। দেশের অবস্থা ভালো না, কখন কার উপর কোন বিপদ আসে সে ভাবনা সবাই উদ্বিঘœ। জাফর ইমতিয়াজের পরিবার যখন চিৎকার চেঁচামেছি করছে প্রতিবেশিরা তখন যার যার ঘরে নিঃশব্দে পড়ে রইলো। ইচ্ছে থাকলেও অস্ত্রের ভয়ে সামনে আসার কেউ সাহস পেলো না। কারো বুঝতে বাকি রইলো না যে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার খবর পেয়ে ওরা দুই ভাইয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে পাক হানাদাররা। কিন্তু সবার মনে প্রশ্ন ছিলো হানাদার ক্যাম্পে কে এই খবর দিলো? আমাদের গ্রামে তো কোন রাজাকার নেই। স্ত্রী সন্তানের কান্নাকটি কিছুই কাজ হলো না। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে ইমতিয়াজের বউ সামনে এসে বলে আমি আটমাসের গর্ভবতী আমার পেটের সন্তান কোন দোষ করেনি তাকে কেনো পিতৃহারা করছেন ? আমার স্বামীকে ছেড়ে দিন। আমি সামনে যেতে পারিনি। কারণ তুই ছিলে পেটে। আমার দু’ পাশে আরো দুটি সন্তান ধরে রেখেছিলো ওদের হারানোর ভয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কারো কোন কান্না না শুনে চোখে মুখে কালো কাপড় বেধে হাত শক্ত করে বেধে পিঠে আঘাত করতে করতে নিয়ে গেলো তাদের। ঘোর অমাবশ্যা নেমে এলো আমাদের পরিবারে। ওদের কোথায় নিয়ে গেলো, কারা নিয়ে গেলো কিছুই জানতাম না। শুধু বিশ্বাস ছিলো ওরা ফিরে আসবে। ওরা অনেক শক্তিশালী ও সাহসী ওদের কেউ মারতে পারবে না। রাত পোহাতেই আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশী সবার জানা জানি হলো। গোপনে চারদিকে খুঁজতে লোক বের হয়েছে। পাতামী এসে আমাদের সাথে কান্না কাটি করলো। কি ভাবে হলো এই কাজ জানতে চাইলো। তখনো আমরা কেউ কিছু জানতাম না। আর দশটা মেয়ে মানুষের মত সেও খুব স্বাভাবিক ভাবে আমার সন্তানদের কুলে নিয়ে আদর করলো। চোখের জল ফেলল। সাতদিন পর চিতলির হাওরে লাশ পঁেচ ভেসে উঠলো। খবর পেয়ে গিয়ে দেখলো এটাই জাফর কিন্তু ইমতিয়াজ কোথায় ? সারাদিন ডুবায় নালায় খোঁজ চলল, সন্ধায় এক জেলে এসে জারমুনির ধামের ভিতর থেকে বের করলো ইমতিয়াজকে। তার দেখা ঘটনাটি বর্নণা করলো সবার সাথে। লোকটি বললো, শেষরাতে চাঁদ উঠলো। হওরে জাল ফেলতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ গম ক্ষেতের ওপাশ থেকে দস্তাদস্তি দেখতে ফেলাম। পিছনে হাত বাঁধা দুটি লোককে খুব মারছে। বেয়নেটের আঘাতে মাথা ফেটে রক্ত ঝড়ছিলো। ওরা বাঁচার জন্য খুব চেষ্টা করছে। জাফর হুংকার দিয়ে বললো, এভাবে মারছিস কেনো ? বীর হলে চোখমুখ খুলে দেয়। খুলে দেয় হাতের বাঁধন। ওরা হাসতে হাসতে চোখের বাঁধন খুলে দিলো। জাফর ওদের চিনতে পেরেছে। কি যেনো বলছে তাদের অট্রহাসির আওয়াজে শুনতে পারিনী। ইমতিয়াজ বলেছে তোমাদের সাথে তো আমাদের কোন শুত্রæতা নাই। তোমরা পাকবাহিনীও নও তাহলে কার আদেশে আমাদের মারতে এসেছ ? ওরা হাসলো আর বললো জেনে কি করবে ? মরার জন্য প্রস্তুত হও। জাফর বললো মরার আগে সবারই কিছু ইচ্ছা পূরন করা হয়। আমাদের ইচ্ছে, কার কথায় তোমরা আমাদের মারছো ? সে কথা জানাও একজন বললো, পাতমী, পাতামী আমাদেরকে ভাড়া করেছে তোদের মারার জন্য। হাঃ হাঃ হাঃ কি মজা পাতামী রাজাকারের এলেম আছে বটে, মিলিটারি ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে দেশের সকল খবর পৌছে দিচ্ছে। তোদের মত তাগড়া যুবকদের পর্যন্ত গায়েল করে ফেলেছে। এরই ফাঁকে ইমতিয়াজ মাথা দিয়ে পাশের লোকটির মাথা আঘাত করলো, লোকটি পড়ে যায়। হলস্তুল লাগলো এই ফাঁকে ইমতিয়াজ চিৎকার দিয়ে বললো ভাই ফালা। জাফরকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে ঝাঝড়া করে দিলো। জাফর মাঠিতে লুটিয়ে পড়লো। দস্যুদল সকল গম ক্ষেতে তন্যতন্য করে খুঁজতে লাগলো আমি জারমুনি মাথার উপর দিয়ে সবই দেখছি। ঘন্টা খানেক পর ইমতিয়াজ ঝুপের আড়াল থেকে উটে দাঁড়িয়ে চোকি দিয়ে দেখলো জাফর কোথায় আছে। সে ভেবেছিলো তার ভাই ফালিয়েছে দস্যু দলও এতক্ষনে চলে গেছে। কিন্তু হায়নার দল উৎপেতে ছিলো। ইমতিয়াজ দাঁড়ানোর সাথে সাথে তাকে ধরে ফেললোসএবং আঘাত করতে লাগলো। জাফরের মৃত লাশ দেখে ইমতিয়াজ বলে উঠলো আমি আর ফালাবো না, আমার ভাই যখন নাই, আমিও আর বাঁচতে চাইনা। আমাকে তোমরা মেরে ফেল। তখন ইমতিয়াজকে জবাই করা হলো। দুরে আযান ধ্বনি শুনা যায়, দস্যু দলকে পালাতে হবে, খুব দ্রæত লাশগুলো হেচড়ে পানিতে ফেলে দিয়ে আসলো। তখন আমি বাঁশের কঞ্চি দ্বারা জারমুনির ধামের ভিতর আটকে রেখেছিলাম। যদি কেউ খুঁজতে আসে তাদের জানাবো বলে। লাশ বাড়িতে আনার পর সবার জানা জানি হলো কে এই কাজ করেছে। তেমন কেউ দেখতে আসেনি, দেখার মত আকৃতি ছিলো না। শরিলের নানা জায়গা মাছে বাসা বেঁেধছে, চোখের কুঠুর থেকে চিংড়ি মাছ বের করা হলো। পঁচা গন্ধে বাড়ীতে ঢুকা যাচ্ছিলো না। এমন জোড়া খুন এই গ্রামে এর আগে কেউ দেখেনি। খুব দ্রæত দাপন-কাপন সেরে লোকজন চলে গেলো। পাছে আবার রাজাকাররা কার নামে আর্মি ক্যাম্পে নালিশ করে কে জানে। সব কিছু জানার পরও আজ ৪৫ বছর ধরে একই বাড়ীতে সহ্য করছি পাতামীকে। এক ঘাটে গোসল করি এক কলের পানি পান করি। আদম আলী উত্তেজিত হয়ে বলে ওর বিচার করলে না কেনো? আদমের মা চোখ মুছে বলল সে অনেক কথা বাবা। সারাজীবন ভয়ে ভয়ে থেকেছি, কিছু করতে গেলে যদি তোদেরকে হারাতে হয় ? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তোর ভাইয়েরা রুখে দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু তোর দাদা সে দরজা জনমের মত বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছেন। তিনি বলেছেন আল্লাহ পাতমীর বিচার করবে, যাই করো না কেনো আমার ছেলেরা আর ফিরে আসবে না বরং নাতীদের হারানোর আশংকা থাকবে। তাছাড়া বংশ মর্যাদা বলে তো কিছু আছে- চৌদ্ধ পুরুষের গড়ে যাওয়া ইজ্জ্বত ধুলো মিশবে। সারা বাংলা জানবে এই বাড়ীর বউ রাজাকার। আদম আলী অস্থির হয়ে বললো, না মা দাদার মত ভালো মানুষ আমি হতে পারবো না। এখন দেশে নতুন করে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হচ্ছে সরকার জেলায় জেলায় তালিকা নিচ্ছে। আমি পাতমীর নাম সে তালিকা যুক্ত করবো। পিতা হত্যার প্রতিশোধ নেবো আমি। আদমের মা ছেলের মাথা হাত বুঝিয়ে বললো, না বাবা আর দরকার নেই, তিন যুগ সহ্য করেছি এখন আর বিচার হলেই কি হবে ? তাছাড়া আল্লাহর হাতে যে বিচার ছেড়ে দিয়েছি তা নিজের হাতে করতে পারবো না আদম। আল্লাহ দুনিয়াতে ও কিছু বিচার করে। আমাকে স্বামী হারা করে কিছু দিন পর ওরা মা মেয়ে একদিনেই বিধবা হয়েছিলো। লোকের মুখে মুখে তখন অনেক কথাই শুনেছে পাতামী।

(গল্পটি মাসিক পত্রমিতালি’র ডিসেম্বর সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়েছে)

শেয়ার করুন




 

 

 

 

© 2017-2020 All Rights Reserved Amadersunamganj.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!